পিরোজপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে সুন্দরবনের দু’টি জলদস্যু বাহিনীর ২০ সদস্যের আত্মসমর্পণ
পিরোজপুরে আজ বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুুজ্জামান খান কামালের কাছে অস্ত্রসহ সুন্দরবনের জলদস্যু মনজু বাহিনীর প্রধান মো. মানজু সরদার এবং মজিদ বাহনীর প্রধান মো. তাকবির বাগচি ওরফে মজিদসহ দু’টি জলদস্যু দলের ২০ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে।
র্যাব-৮ বরিশালের উদ্যোগে পিরোজপুর জেলা ষ্টেডিয়াম মাঠে বেলা সাড়ে ১১ টায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর হাতে অস্ত্র ও গোলাবরুদ তুলে দিয়ে জলদস্যুরা এই আত্মসমর্পণ করেন।
সুন্দরবনের জলদস্যু মনজু বাহিনীর প্রধান মো. মানজু সরদারসহ ১১ জন সদস্য এবং মজিদ বাহনীর প্রধান মো. তাকবির বাগচি ওরফে মজিদসহ ৯ জন সদস্য আত্মসমর্পন করেছেন। এ সময় আত্মসমর্পনকারীরা ৩৩টি বিভিন্ন ধরনের দেশী বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৩২৯ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদ জমা দেয়।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বিশ^ ঐতিহ্য আমাদের সুন্দরবনকে পর্যটন ও মৎস্য সম্পদ আহরণের স্বার্থে রক্ষার জন্য জলদস্যু দমন আমরা যে ধারাবাহিকভাবে অব্যহত রেখেছি তারই অংশ হিসেবে এই ডাকাতদের স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ। এ পর্যন্ত র্যাব যে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে তাতে গত ১১ মাসে ১২টি বাহিনীর ১৩২জন জলদস্যু, ২৪৯টি অস্ত্র ও ১২৫৯২ রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। আজ আরও ২০ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে এই সংখ্যা ১৫২ তে দাড়িয়েছে। এখনও আরও তিনটি জলদস্যু বাহিনী সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে বলে আমাদের কাছে খবর রয়েছে। আমাদের অনুরোধ এই বাহিনীগুলো অবিলম্বে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। তা নাহলে তারা হয় নিজেদের লোকের হাতে খুন হবে, নইলে আইন শৃংখলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হবে। তাই বলছি এখনও সময় আছে দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে আসুন। সমাজ, সরকার আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আর ফিরে না আসলে, আত্মসমর্পন না করলে তাদের জন্য যে ভয়ঙ্কর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন রয়েছে তার পরিনাম খুবই খারাপ। 
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। অতীতে যারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছে তাদের মধ্যে একজন বাদে বাকিরা জামিনে রয়েছে। একজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থাকায় তাকে আইনগত কারণেই মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়।
মন্ত্রী বলেন, আত্মসমর্পনকারী জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য, তাদের স্বাবলম্বি হওয়ার জন্য মাননীয় প্রধান মন্ত্রী এক লাখ টাকা, র্যাব ২০ হাজার টাকা এবং এক্সিম ব্যাংক আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যু প্রতি ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছে। যে অনুুদান দেয়া হয়েছে তা দিয়ে এরা ইতিমধ্যে আত্মকর্মসংস্থান মূলক পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে শুরু করেছে।
পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামে বরিশাল র্যাব-৮ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার হাসান ইমন আল রাজির সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন এ কে এম এ আউয়াল এমপি, র্যাবের মহপরিচালক মো. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার), পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সেখ, পুলিশ সুপার মো. ওয়ালিদ হোসেন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ, পৌর মেয়র মো. হাবিবুর রহমান মালেক প্রমুখ। এছাড়া আত্মসমর্পণকারী জলদস্যু বাহিনীর প্রধান মো. মানজু সর্দার ও জলদস্যুদের গুলিতে গুরুতর আহত জেলে আব্দুল আলিম বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে র্যাব ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, মৎস্যজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে র্যাব মহা পরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের রাষ্ট্রে, সরকারে কোন দস্যুবৃত্তি চলবে না। এখানে মানুষ নিজ নিজ পেশায় নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবে। এখানে মানুষ নিরাপত্তাবোধ নিয়ে জীবন যাপন করবে। এর পরিপন্থি কাজ যারা করবে তাদের প্রত্যেককেই আইনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারবে না। কোন গডফাদার, কোন গড মাদার তাদের বাঁচাতে পারবে না। তাই এখনও যারা দস্যুতার সাথে জড়িত আছে তাদেরকে ফিরে আসতে বলছি। তোমাদের পরিবার অপেক্ষা করছে, তোমাদের জন্য সমাজ, সরকার অপেক্ষা করছে। তা না হলে তোমাদের কেউ বাঁচাতে পারবে না। র্যাবের হাতেই তোমাদের মরতে হবে।
অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণকারী জলদ্যুরা হলো মানজু বাহিনীর প্রধান মোঃ মানজু সরদার (৪৪), জুলফিকার ইজারদার (৪৬) মোঃ বাচ্চু মল্লিক (৩২), মোঃ তৌহিদুর রহমান শেখ (৫০), মোঃ রেজাউল ইসলাম (২৫), মোঃ পলাশ খান (৩৪), মোঃ সুমায়ন ফকির (২৫), মোঃ জামরুল শেখ (৩০), মোঃ মজির ইজারদার (৩২), মোঃ হাওলাদার আলমগীর (৩৮), মোঃ হানিফ সেখ (৩২)। এছাড়া মজিদ বাহিনীর প্রধান মোঃ তাকবির কাগচী ওরফে মজিদ (৩৮), মোঃ হাসান বিশ্বাস, মোঃ আব্দুল মজিদ, মোঃ ইউনুছ শেখ, মোঃ হাফিজুল ইসলাম, মোঃ আফজাল খান, মোঃ এসকেন খান, মোঃ হাসান আলী ইজারদার, মোঃ মোসা ইজাদ্দার। এদের সকলের বাড়ি বাগেরহাট ও সাতক্ষিরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায়।
জলদস্যুদের আত্মসমর্পনের বিষয়ে র্যাব এক প্রেসনোটে জানায়, ৩১ অক্টোবর মঙ্গলবার সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে এবং আন্ধারিয়া নামার চরে বরিশাল র্যাব-৮ এর সদস্যরা অভিযান পারচালনা করার সময় জলদস্যু মানজু বাহিনী এবং মজিদ বাহিনীর সদস্যরা র্যাবের তথ্যদাতার মাধ্যমে আত্মসমর্পনের কথা বলে এবং এদিন দুপুর ২ টার দিকে সুন্দরবনের মৃগামারির শ্যালা নদী সংলগ্ন এলাকায় জলদস্যু মানজু বাহিনীর প্রধান মো. মানজু সরদারসহ তার দলের ১১ সদস্য র্যাবের কাছে ধরা দেয়। এ সময় র্যাব তাদের তথ্যমতে জঙ্গলে অভিযান চালিয়ে বস্তাভর্তি ১৯টি দেশী বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৮৫৩ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করে।
অন্যদিকে একই দিন বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে সুন্দরবনের আন্ধারিয়া নামার চরে মজিদ বাহিনীর প্রধান মো. তাকবির কাগচি ওরফে মজিদসহ ৯ জলদস্যু র্যাবের কাছে ধরা হয়। র্যাব তাদের কাছ থেকে ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪৭৬ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করে।
পরে র্যাব আত্মসমর্পনকারী জলদস্যু ও গোলাবারুদ নিয়ে মংলা থানায় নিয়ে যায়। গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে এসব জলদস্যু আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করে।
র্যাব-৮ জানায়, আত্মসমর্পনকারী জলদস্যুদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ১১টি বিদেশী একনালা বন্দুক, ৭টি দোনালা বিদেশী বন্দুক, ৫টি পয়েন্ট টু-টু বোর বিদেশী এয়ার রাইফেল, ৬টি ওয়ান শ্যুটার, ৪টি কাটা রাইফেল এবং ১৩২৯ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গুলি।
র্যাব জানায়, বুধবারের আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত ১৩টি জলদস্যু বাহিনীর ১৫২ জন জলদস্যু সদস্য রাবের কাছে আত্মসমর্পন করেছে।
