প্রধান সূচি

জেলেদের সমুদ্র যাত্রা

শুটকি মৌসুমে ২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে বনবিভাগের লক্ষ্যমাত্রা

বঙ্গোপসাগরের দুবলার চরে মৎস্য আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়া মৌসুমকে সামনে রেখে জেলেরা সমুদ্র যাত্রা শুরু করেছে। গত ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণ ও সুন্দরবনে সব ধরনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পরই মঙ্গলবার ভোর থেকে শত শত জেলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর দস্যুদের উৎপাতের শংকা মাথায় নিয়ে মংলার পশুর নদীর চিলা মোহনা থেকে একত্রে জাল-নৌকা ও শুটকি তৈরির উপকরণ নিয়ে সাগর পাড়ের দূর্গম চরাঞ্চল ও সমুদ্রের উদ্দেশ্যে রওয়ান হয়। এবারের শুটকি আহরণকে কেন্দ্র করে বনবিভাগ থেকে দুই কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। গত বছর এর লক্ষ্য মাত্রা ছিল দেড় কোটি টাকা। বনবিভাগ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

পর্ব সুন্দরবনের সদরের এসিএফ (সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা) মো ঃ মেহেদীজ্জামান জানান, দুই কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা নিয়ে দুবলার চরে এবারের শুটকী আহরণে জেলেদের শরনখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ছয় হাজার পাস পারমিট দেয়া হয়েছে। রাজস্ব আদায়কে কেন্দ্র করে জেলেদের মাছ আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়াকরণের জন্য তাদের নিরাপত্তাসহ সব রকম ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, এসব জেলেদের জন্য চরে ৮৭০টি জেলে ঘর এবং জেলে মহাজনদের জন্য ৩৮টি ডিপো ঘরের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ২৮ ফিট দৈর্ঘ এবং ১২ ফিট প্রস্থ নির্ধারণ করে ঘরের মাপও ঠিক করে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে বেশি আকারের ঘর তৈরী করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেন তিনি।

প্রতিবছর অক্টোবর মাস থেকে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকায় সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়াকরণের মৌসুম শুরু হয়ে থাকলেও সুন্দরবন এলাকায় ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশসহ সব ধরণের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় এবার ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের মৌসুম। আগামী ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত মংলা, রামপাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশালসহ সুন্দরবন উপকূলের কয়েক হাজার জেলে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির জন্য সাগরপাড়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলবে। এছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলে ও মৎস্যজীবীরাও আসবেন এখানে। ইতিমধ্যে উপকূলের হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীরা দুবলার চর এলাকায় মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কাজে যোগ দিতে শুরু করেছেন।

মঙ্গলবার ভোরের জোয়ারে মংলা, রামপাল, দাকোপ, শরণখোলা, পাইকগাছা, শ্যামনগরসহ সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার জেলে নৌকা, ট্রলার ও জাল নিয়ে মাছ ধরা ও শুঁটকি তৈরীর উদ্দেশ্যে লোকালয় ত্যাগ করে দুবলার চরের পথে রওনা দিয়েছেন।

এদিকে জেলেদের অভিযোগ, দুবলার চরে যাওয়ার পথে এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে দস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে থাকেন তারা। তাই চলতি মৌসুমে জেলেরা যাতে সাগরে নির্বিঘেœ মাছ শিকার ও শুঁটকি তৈরি করতে পারেন সেজন্য প্রশাসনকে নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী জেলে ও মহাজনেরা।

এ ব্যাপারে মৎস্যজীবীদের বৃহৎ সংগঠন ‘দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপে’র সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন জানান, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও জলদস্যুদের উৎপাতের আতঙ্ক মাথায় নিয়েই উপকূলীয় অঞ্চলের মৌসুমী জেলেরা জাল-নৌকা ও মৎস্য আহরণের উপকরণ নিয়ে সাগরপাড়ের জেলে পল্লীতে ছুটছেন। জেলেদের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

জেলে ও মহাজন সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি  মৌসুমকে ঘিরে এ বছর ১০-১৫ হাজার জেলে ও মৎস্য আহরণকারী জড়ো হয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চর, মেহেরআলীর চর, আলোরকোল, অফিসকিলা, মাঝেরকিলা, শেলার চর ও নারকেলবাড়িয়া চরে। সুন্দরবন অভ্যন্তরে ছয়টি মৎস্য আহরণ, শুটকি প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র নিয়ে এ দুবলা জেলে পল্লী। দুবলা জেলে পল্লীর জেলেরা নিজেদের থাকা, মাছ ধরার সরঞ্জাম রাখা ও শুটকি  তৈরির জন্য অস্থায়ী ডিপো ঘর ও মাচা তৈরি করেন। জেলেরা সমুদ্র মোহনায় বেহুন্দীসহ বিভিন্ন প্রকার জাল দিয়ে মাছ ধরে তা বাছাই করে মাছ শুটকি করে। পরে সে শুটকি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও বাজারজাত করে থাকেন।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান জানান, দুবলার চরে অবস্থানরত জেলেরা সুন্দরবনের গাছ দিয়ে ঘর তৈরি বা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। গত শুটকি মৌসুমেও সুন্দরবনের গাছ ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি।

বন বিভাগের খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধূরী জানান, জেলে ও মৎস্যজীবীরা পাস-পারমিট ছাড়া সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জেলেদের কাছ থেকে যদি সুন্দরবন বিভাগের কেউ অবৈধভাবে টাকা আদায় করে থাকে এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে চলতি মৌসুমের শুরুতেই নানামুখি উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।

 

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial