প্রধান সূচি

মিজানুর রহমান মিলটন

এমন সন্তান চাই না

সম্মান, যশ, প্রতিপত্তি সব পেয়ে আমরা সুখি নই, সবাই বড় বেশি অসুস্থ। আমাদের এ অসুস্থতা মনে। তাই সামাজিকভাবে আমরা যতটুকু এগোচ্ছি তার চেয়ে মনের দিক দিয়ে ক্রমশ কয়েকগুণ পিছিয়ে যাচ্ছি। মন-মানসিকতার এহেন পশ্চাদগামিতায় বর্তমান সময়ে মানবিক মূল্যবোধের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের গবেষণা এটা প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি বিকশিত করছে কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়রোধে যে মূল্যবোধের প্রয়োজন তার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র। শিক্ষা মানুষকে প্রজ্ঞাবান করলেও বিবেকবান করতে পারছে না অনেকাংশে। ফলে কখনো কখনো আমরা এমন আচরণ করি যা আমাদের সমস্ত জ্ঞান-গরিমাকে সমাজের চোখে বড় বেমানান করে তোলে।

আধুনিক শিক্ষিত সমাজের অধিকাংশ লোক মা-বাবার প্রয়োজনীয়তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি না। জীবনের পড়ন্তবেলায় আপন সন্তানের চরম অবহেলা অনাদরে নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন, এমন হতভাগ্য মা-বাবার সংখ্যা এ দেশে নেহায়েত কম নয়। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সন্তানের কাছে বৃদ্ধ মা-বাবা বোঝাস্বরূপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদিও আমরা চক্ষুলজ্জায় এ ধরনের অপ্রিয় সত্যকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারি না। তবু বলতে বাধা নেই যে, সন্তানের দ্বারা বৃদ্ধ বাবা-মা হরহামেশা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। আর শিক্ষিত সন্তানদের মধ্যে এ অসামাজিক প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ মূল্যবোধহীন শিক্ষা এসব শিক্ষিতদের নৈতিকতাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ফলে অবচেতন মনে তারা মা-বাবার কথা ভাবতে পারে না। অথচ আত্মকেন্দ্রিক সন্তানের চরম অবহেলাকে নিত্যসঙ্গী করে বেঁচেও মা-বাবা একটি ক্ষণের জন্য সন্তানকে ভুলতে পারেন না। কারণ তাদের পক্ষে নাড়ির সম্পর্ক, রক্তের সম্পর্ককে কোন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয় না।

মা-বাবার অনাবিল স্নেহ-মমতায় আমরা বড় হলাম, একটি সময়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেলাম, কিন্তু তারপর স্বার্থপরের মতো ভুলে গেলাম তাদের কথা, যারা আমাদের পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখাল, নিজে না খেয়ে আমাদের খাওয়াল, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য যারা সমস্ত আরাম-আয়েশকে পায়ে ঠেলল, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের শুভ চিন্তায় উদগ্রীব থাকল। এতকিছুর পর রিক্ত হাতে চলে যাওয়া মা-বাবাকে ন্যূনতম একটু প্রতি-ভালোবাসা তাদের শেষ জীবনে দিতে পারি না আমরা। এ থেকে বড় স্বার্থপরতা আর কি হতে পারে?

এত কিছু লেখার পিছনে মঙ্গলবার দৈনিক খুলনাঞ্চলসহ বিভিন্ন  দৈনিকে প্রকাশিত ‘একটি দু’মুঠো ভাতের জন্য ভিক্ষা করছেন তিন পুলিশ কর্মকর্তার মা!’ শিরোনামের সংবাদটি। প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়, তিন পুত্র পুলিশ কর্মকর্তা এবং এক কন্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। অথচ তাদের গর্ভধারিণী দু’মুঠো আহারের জন্য দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছেন। এমন দুর্ভাগ্য বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের মৃত আইয়ুব আলী সরদারের স্ত্রী মোসা. মনোয়ারা বেগমের (৭০)। আয়ুব আলী সরদার কৃষক হলেও ৬ সন্তান নিয়ে অভাব-অনটনের সংসারে ভালোভাবেই দিন কাটছিল। গত ২০১৪ সালের পহেলা অক্টোবর আইয়ুব আলী সরদার মারা যান। ৬ সন্তানের প্রত্যেককে কম-বেশি শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন আয়ুব আলী। তাদের মধ্যে তিন সন্তান এএসআই ও একমাত্র কন্যা শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। অন্য দু’ সন্তানের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অন্যজন ইজি বাইক ভাড়ায় চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ তাদের গর্ভধারিণী মায়ের দুর্ভাগ্য যে, তিনি শেষ বয়সে এসে দুটো ভাতের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করছেন।

এছাড়া ৪-৫ মাস আগে ভিক্ষা করতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে যান মনোয়ারা বেগম। ওই ঘটনায় তার কোমরের হাড় ভেঙে যায়। ওই সময় থেকে সোমবার পর্যন্ত বাবুগঞ্জে স্টিল ব্রিজের পশ্চিম প্রান্তের একটি খুপড়ি ঘরে বিনা চিকিৎসায় অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি।

খবরটি চাউর হওয়ার পরে জেলা পরিষদের সদস্য ফারজানা বিনতে ওহাব গত সোমবার সকালে ডাক্তার নিয়ে বাবুগঞ্জের ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে মনোয়ারা বেগমের জীর্ণ কুটিরে হাজির হন। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশক্রমে ইউএনও ও স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা সোমবার তাকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। এদিকে গতকাল বুধবার বরিশাল রেঞ্জের উপ-মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়ে তিনি এ দায়িত্ব নেয়ার কথা বলেন। তিনি একই সঙ্গে তদন্ত সাপেক্ষ মা মনোয়ারার সন্তানদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন।

তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত সন্তানের দ্বারা মা-বাবারা বেশি অবহেলিত। ব্যক্তিগতভাবে আমি দেখেছি, বহু সন্তান রয়েছেন যারা জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়ে নিজের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে বছরের পর বছর মা-বাবাকে ছেড়ে দিব্যি রয়েছেন। এমনকি স্ত্রীর প্ররোচনায় মা-বাবাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন এমন মানবরূপী দানবদেরও দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যে, হাজারো নিপীড়ন-নির্যাতন সত্ত্বেও মা-বাবা বলেন, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।

এটা কি অস্বীকার করা যায় যে, প্রতিটি মানব সন্তানের জীবনে মা-বাবার অবদান অপরিসীম। মা অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন। সীমাহীন ধৈর্য্য ও অতুলনীয় মমতায় লালন-পালন করে সন্তানকে ধীরে ধীরে বড় করে গড়ে তোলেন। পিতা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানের ভরণপোষণের সংস্থান করেন। সহায়-সম্বল নিঃশেষ করে দিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন। সে পিতা-মাতা বৃদ্ধ বয়সে সর্বস্ব সন্তানের পেছনে বিনিয়োগ করে নিজেরা অসহায় হয়ে সন্তানের পেছনে করুণার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন। নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে অসহায় মা-বাবাকে সন্তানের চরম অবজ্ঞা-অবহেলায় নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে মানবেতর দিন যাপন করতে হয়। যেমনটি করছেন অসহায় মা মনোয়ারা বেগম।

কিন্তু আজও হজরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মাতৃভক্তির কাহিনী কিংবদন্তি হয়ে আছে। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের হুগলী নদী সাঁতরে অসুস্থ মাকে দেখতে যাবার কাহিনী আমাদের অসুস্থ মনে সুস্থতার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। নিজেদের আরামকে হারাম করে মা-বাবা সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। তাই মা-বাবার প্রতি সন্তানের অগ্রহণযোগ্য আচরণ কোনভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। সন্তানের অনাদর-অবহেলায় নির্যাতিত মা-বাবার সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার জন্য সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবার অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে ‘মাতা-পিতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ প্রণীত হয়েছে। সংসদ কর্তৃক প্রণীত এই আইনটি ২৭ অক্টোবর ২০১৩ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি লাভ করে। পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রণীত আইনটি বর্তমানে কার্যকর। কিন্তু মজার বিষয় হলো আইনের রক্ষক পুলিশের এএসআই তিন পুত্র ও স্কুল শিক্ষিকা কন্যাসহ ৬ সন্তান ওই আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসহায় মা মোসা. মনোয়ারা বেগমের প্রতি করেছে চরম অবহেলা। আমরা চাই বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে ওই মানুষরুপী দানবদের বিচার হবে।

একই সাথে বলতে চাই, শুধুমাত্র আইন দিয়ে মা-বাবার প্রতি অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অপরাধ রোধ করা সম্ভব নয়। এই জন্য প্রয়োজন উচ্চমাত্রার নৈতিকতা বোধ, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস এবং তা যথাযথ পালন। প্রয়োজন পারিবারিক, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করা। যারা মা-বাবার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করে না তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আমাদের নিজ নিজ মাতা-পিতা ও তাদের অবর্তমানে নিকটাত্মীয়দের প্রতি সম্ভব সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সুন্দর পারিবারিক জীবন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখতে পারে। তাদের মাধ্যমে পরবর্তীতে আমাদের সন্তানরাও আমাদের প্রতি দায়িত্বশীল হবে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক খুলনাঞ্চল।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial