জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
॥ ফসিউল ইসলাম বাচ্চু ॥
“একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এ নিরন্তর সম্পৃক্ততার উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি ও অস্তিত্বকেই অর্থবহ করে তুলে।” এ কথাগুলো বলেছিলেন বাঙ্গালীর অবিসংবর্ধিত নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে বিনম্র শ্রদ্ধাসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একথা দিয়েই আমার এ লেখা শুরু করছি। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এ নাম দুটি সমার্থক অথবা একে অপরের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধুর নামের সাথে মিশে আছে বাংলাদেশ। যাকে কোনোভাবে আলাদা করা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ, ফুল, ফল, পাখি বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলের মাঠ, নদী-নালা, খাল-বিল, জীববৈচিত্র্যকে যিনি আপন করে নিতে পেরেছিলেন গভীর মমত্ববোধে। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন আর স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছিলেন তার অপরিসীম দূরদর্শিতা, স্নেহ, মমতা, ভালোলাগা-ভালোবাসার দুর্দমনীয় টানে।
কোনো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রই তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। তিনি ছিলেন অকুতোভয়, সাহসী, সৎ চিন্তার অধিকারী, দায়িত্বশীল পরিপূর্ণ মানুষ, স্বামী, পিতা, ভাই, নেতা, সর্বোপরি জাতির পিতা, বাঙালি জাতির নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। তার ব্যক্তিত্ব, চিন্তাশক্তি ছিল অতুলনীয়। তার ভরাট কন্ঠস্বর, সময়োপযোগী শব্দচয়ন, বক্তব্যের প্রকাশভঙ্গি, শারীরিক উচ্চতা ও নেতৃত্বসুলভ চেহারা, দৃঢ়তা- সবকিছুই তাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের কন্ঠস্বর হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি। বাঙালি জাতিসহ অধিকারহারা মানুষদের তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন, উৎসাহিত করেছেন। তিনি ছিলেন নির্মোহ ও নির্লোভ একজন মানুষ। বাঙালি জাতিকে তিনি শুধু আবাসভূমি ও স্বাধীনতা দিয়েই যাননি, জাতি গঠনে তিনি যে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক ও উন্নত জীবন গঠনে তিনি যে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তারই সুফল আমরা ভোগ করছি। তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কর্মসূচি তার যোগ্য উত্তরসূরি তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে নিচ্ছেন।
কিছু স্বার্থান্বেষী মতলববাজ, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গববন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের জীবনদান, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হওয়া- এসব বাস্তব সত্যকে অস্বীকার অথবা বিতর্কিত করে আসছে। তারা চিরকালই পাকিস্তানের দালাল ও রাজাকার হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকবে। বাঙালি জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে কথা বলতে তারা লজ্জা পায়। পাকিস্তানের নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা কত ভয়ানক ছিল, তা বলে শেষ করা যায় না। বাবার সামনে মেয়েকে, ছেলের সামনে মাকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ- কী নির্মম নিষ্ঠুরতা। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের বর্বরোচিতভাবে হত্যা করেছে তারা। মৃত্যুর আগে পানি খেতে চাইলে মুখে প্র¯্রাব করে পানির তৃষ্ণা মিটিয়ে দিত সেই হায়েনার দল। সেদিন আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল।
দেশের শ্রেষ্ঠসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ আজও রিকশা চালায়, কেউ দিনমজুর, কেউ অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করে, কেউ রোগে আক্রান্ত হয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারেনি, অল্প শিক্ষিত হওয়ায় তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। চাকরির ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে না পারার কারণে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি হয় না অনেকেরই। আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপট খুব বেশি।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। আজ থেকে ৪২ বছর আগে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে (তার দুই মেয়ে ছাড়া) নির্মমভাবে হত্যা করে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য- মেজর ডালিম, কর্নেল রশীদ, কর্নেল ফারুক, হাবিলদার মুসলেহ উদ্দিন, কর্নেল পাশা, ক্যাপ্টেন কিসমতসহ আরও অনেকে। খন্দকার মোশতাক ছিলেন নাটের গুরু। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করার বিষয়টি কর্নেল রশীদ ও ফারুকের মাধ্যমে জানতেন। বিবিসির কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রশীদ, ফারুক সে কথাই স্পষ্ট করে বলেছেন। বহুবার রেডিও-টেলিভিশনে তাদের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে। জিয়া তখন উপপ্রধান সেনাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি এমন খবর সরকার উৎখাতকারীদের কাছ থেকে জানার পরও তাদের উৎসাহিত করেছেন, বঙ্গবন্ধুকে অবগত করার প্রয়োজন মনে করেননি। এর অর্থই হল তিনিও জড়িত ছিলেন।
আজকের এই দিনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী এবং ষড়যন্ত্রকারী সকলকে আইনের আশ্রয়ে এনে বিচারের দাবী জানাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের মধ্যে যারা বিদেশে আছে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবী জানাচ্ছি।
