প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়া আর নেই
কন্ঠ রিপোর্ট :
মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ আর নেই। তিনি আজ শুক্রবার দুপুর ১.১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময়) সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা যান (ইন্নালিল্লাহি…….রাজিউন)।
মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। গত ১২ জুলাই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স সিঙ্গাপুর নেয়া হয়। এর আগে তিনি দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার দু’টি কিডনী এবং লিভার খারাপ অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তখন আইসিইউতে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
মেজর জিয়া উদ্দিন আহম্মেদের ছোট ভাই কামাল উদ্দিন আহম্মেদ জানান, বৃহস্পতিবার দিনগত বাংলাদেশ সময় রাত আড়াই টার দিকে মেজর জিয়ার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে আজ শুক্রবার দুপুরে তিনি মারা যান।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, দুই ভাই ও এক বোন রেখে গেছেন।
মেজর জিয়ার ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম জানান, আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ মেজর জিয়ার মৃতদেহ সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় আনা হবে। তবে তার দাফন কোথায় দেয়া হবে তা এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তিনি জানান, লাশ ঢাকায় আনার পরে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তাকে ঢাকায় না পিরোজপুরে দাফন দেয়া হবে।
মেজর জিয়া উদ্দিন আহম্মেদের পূর্ব পুরুষের বাড়ী পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়ায়। আইনজীবি পিতা আফতাব উদ্দিন আহমেদের ছেলে জিয়া উদ্দিন ১৯৫০ সালে পিরোজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাঁর আপন চাচাতো ভাই। পিরোজপুর সোহরাওয়ার্দী কলেজে ¯œাতক শ্রেণীতে অধ্যায়নকালে তিনি ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ৭১’র সালের ২০ মার্চ সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট হিসাবে ছুটিতে বাড়ী আসেন এবং ২৭ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রথমে তিনি পিরোজপুর শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং সুন্দরবনে ঘাঁটি স্থাপন করে ১৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধীনে সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে সুন্দরবনেই সদর দপ্তর স্থাপন করে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে ক্যাপ্টেন ও পরে মেজর পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর পর পর দু’টি সেনা উভ্যূত্থান কালে মেজর জিয়া সরকারি কাজে পিরোজপুর শহরে মুক্তিবাহিনী সদস্যদের পুলিশে ভর্তি জন্য পিরোজপুরে ছিলেন। পরে ঢাকায় ফিরে কর্ণেল তাহেরর নির্দেশে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ঘোষণা করে ৭১ সালের মত ঘাঁটি স্থাপন করেন। ৭৬’র সালের জানুয়ারী মাসে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া মাঝের চরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে কর্ণেল তাহেরসহ মেজর জিয়া এবং জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচার হয়। এ বিচারে কর্ণেল তাহেরকে ফাঁসি এবং মেজর জিয়াকে যাবজ্জীবনসহ অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। ৮০ সালে তিনি সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান এবং জাসদে যোগ দেন। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি সুন্দরবনে দুবলার চরে মাছের ব্যবসা শুরু করেন এবং জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা, জলদস্যু দমন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণসহ বিভিন্ন সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৮৯ সালে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর কিছু স্মৃতি গ্রন্থ রয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের সেই উম্মাতাল দিন গুলো’ ও ‘সুন্দরবন সমরে ও সুসময়’ যার মধ্যে অন্যতম।
মেজর জিয়াউদ্দিন আহম্মেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পিরোজপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মহিউদ্দিন মহারাজ, পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সমীর কুমার দাস বাচ্চু, সাবেক কমান্ডার গৌতম চৌধুরী, পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র মোঃ হাবিবুর রহমান মালেক, পিরোজপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মজিবুর রহমান খালেক, পিরোজপুর উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এডভোকেট এম এ মান্নান, জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সম্পাদক ইত্তেফাক ব্যুরো প্রধান মনিরুজ্জামান নাসিম আলী, জেলা মহিলা পরিষদের সম্পাদিকা সালমা রহমান হ্যাপী, পিরোজপুর প্রেসক্লাব সভাপতি শফিউল হক মিঠু, সাধারণ সম্পাদক ফসিউল ইসলাম বাচ্চু, স্বরূপকাঠী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার জাহিদ হোসেন, ডেপুটি কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক কমান্ডার মজিবুর রহমান, কাজী সাকাওয়াত হোসেন, স্বরূপকাঠী প্রেসক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি কাউসার তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক হালিমুর রহমান শাহীন।
