অস্তিত্ব সংকটে সুন্দরবনের বাঘ।
॥ প্রকাশ ঘোষ বিধান ॥
২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘ রয়েছে বিশ্বের এমন ১৩টি দেশ বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভূটান, নেপাল, মিয়ানমার, মালেশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও রাশিয়ায় এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর ৭ম বিশ্ব বাঘ দিবস। ২০১০ সালে জানুয়ারী মাসে থাইল্যান্ডে হুয়ানে অনুষ্ঠিত হয় টাইগার রেজ্ঞ দেশ সমুহের এশিয়া মিনিষ্ট্রয়াল কনফারেন্স। এখান থেকে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হবে। বাঘ বাঁচানো ও প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষে ঐ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়। সুন্দরবন বনবিভাগ উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন র্যালী ও আলোচনা সভার মধ্যদিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে, সুন্দরবনের মোট আয়তন ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার। এর ২টি বিভাগ পূর্ব সুন্দরবন ও পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের প্রশাসনিক বিভাগ আছে। এর ৪টি রেঞ্জ, পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে শরনখোলা ও চাঁদপাই এবং পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ অবস্থিত। এছাড়া ১৭টি স্টেশন ও ৭২টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বাগেরহাট ও পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের সদর দপ্তর খুলনায় অবস্থিত। এ দুই বিভাগে মোট ১ হাজার ১ শত ৭২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে। ২০০৪ সালের বাঘ গননানুযায়ী সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ ছিল। ২০১৫ সালের বাঘ গননার ফলাফলে দেখা গেছে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১০৬টি বাঘ আর ভারতের অংশে ৬৪টি বাঘ রয়েছে, মোট ১৭০টি বাঘ আছে। যা এক দশক পূর্বের শুমারী থেকে ২৭০টি বাঘ কমেছে। সরকারী পর্যায় এখন পর্যন্ত সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে বড় ধরনের কোন গবেষনা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় বাঘ শুমারী হলেও তার পদ্ধতিগত দিক নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বাঘের আবাসস্থান সুন্দরবন প্রাকৃতিক ভারসাম্য বদলে যাওয়ায় সুন্দরবনের বাঘের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বনে বাঘের জীবন সংকটেপন্ন। বাঘের জীবন চক্রের জন্য সুন্দরবেন যে খাদ্য, স্বাদুপানি, নিরূপাদ্রবও নিরাপদ প্রজনন ব্যবস্থা থাকা দরকার, তবে কোনটাই যথেষ্ট নয়। বাঘের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবন হলেও বাংলাদেশের সুন্দরবনের বাঘ সুরক্ষায় উল্লেখ যোগ্য তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বিভিন্ন দেশে বাঘ বাঁচাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশের সুন্দরবনের বাঘের মৃত্যু আশাঙ্খাজনক হারে বেড়ে গেছে। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যাভাব, বয়সজনিত কারণ এবং চোরা শিকারিদের হাতে বাঘ মারা যাচ্ছে। তাছাড়া মাত্রাতিরিক্ত লবনপানি নেক্লসিস ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হচ্ছে বাঘেরা। অনেক বাঘ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে চিকিৎসার অভাবে। বনের গাছপালা কমে যাওয়ায় আবাসস্থল সংকটে ও খাদ্যভাবের কারনে লোকালয়ে বাঘের অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। লোকালয়ে ডুকে পড়া বাঘের হাতে আক্রমে গরু, ছাগল ও গবাদিপশুসহ মানুষও হামলার শিকার হচ্ছে। এতে মানুষও ক্ষুব্ধ হয়ে পিটিয়ে, কুপিয়ে ও গুলি করে বাঘ শিকার করছে। এদিকে বাঘ রক্ষায় সুন্দরবন বিভাগ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্থানীয় জনগনকে সচেতন করা, লোকালয়ে চলে আসা বাঘ ট্রাংকুলাইজ করে বনে ফেরত পাঠানো, বাঘ মানুষ দ্বন্ধ কমাতে ক্ষতিপুরনের ব্যবস্থাও নিয়েছে বন বিভাগ। তারপরও দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমছে। বনের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বাঘের হামলায় নিহত বা আহত হলে ক্ষতিপূরন দেয়া হচ্ছে। বৈধ পাস পারমিট নিয়ে বনে প্রবেশের বেলায় নিহত হলে তার পারিবারকে ১ লক্ষ্য টাকা এবং আহত হলে চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। তবে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের দেওয়া তথ্য মতে প্রতি বছরই চোর শিকারীরা ফাঁদ পেতে ও বিষ প্রয়োগ করে বাঘ হত্যা করছে। আন্তজার্তিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড়, দাত, চোখসহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ উচ্চ মূল্যে বিক্রি হওয়ায় চোর শিকারীর একাধিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
১৯৮০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত গত ৩৫ বছরে সুন্দরবন ও সংলগ্ন শিকারীদের হানা, গ্রামবাসীর পিটুনী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৬৫টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। প্রানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের বাঘের মৃত্যুর জন্য ৫টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। কারণ গুলো হচ্ছে, শিকারীদের জালে আটকে পড়ে, বনদস্যুদের গুলিতে, ঝড়-জলোচ্ছাস, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষদের মধ্যে অজ্ঞতা ও সচেতনার অভাব এবং সুন্দরবন বিভাগের লোকবল ও প্রয়োজনীয় উপকরন সংকটের কারনে বাঘ সংরক্ষনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হওযায় এসব বাঘ মারা পড়ছে। ফলে সুন্দরবনে বাঘের স্বাভাবিক বংশ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও অস্তিত্বে চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাইদ আলী জানান, সুন্দরবনের বাঘ ও সম্পদ রক্ষায় আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বন বিভাগও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এমনকি শিকারীরা যাতে দ্রুত পালিয়ে না যেতে পারে সে জন্য ইঞ্জিন চালিত বোট চলাচল সুন্দরবনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বন বিভাগের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালী, বনজীবী ও বনের বন্য প্রাণীর নিরাপত্তার জন্য হুমকীসহ বিভিন্ন বিষয়ে মনিটারিং করা হচ্ছে। সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ও বনের রক্ষা কবজ হিসাবে খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বাঁচাতে হলে এখনই সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও জন সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক।
