পিরোজপুর জজ আদালত
কমেছে মামলার জট ॥ ব্যবস্থা করা হয়েছে হাজতিদের দুপুরের খাবারের
কন্ঠ রিপোর্ট :
পিরোজপুর জেলা জজশিপে বিচারক সংকট থাকা সত্ত্বেও জেলা ও দায়রা জজ গোলাম কিবরিয়ার উদ্যোগের ফলে মামলার জট দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করেছে। বছরের পর বছর চলতে থাকা মামলাগুলো বর্তমানে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। ফলে বেশ স্বস্থিতে রয়েছেন জেলার হাজার হাজার বিচার প্রার্থী। মামলা নিস্পত্তির পাশাপাশি আদালতে বিচারের জন্য কারাগার থেকে আনা হাজতিদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা, বিচার প্রার্থী ও আদালতের কাজে আসা লোকজনের বসার জন্য আদালতের প্রতিটি তলার বারান্দায় বেঞ্চ ও সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থাসহ নিরাপদ পানি পানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা ও দায়রা জজের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জেলার আইনজীবীসহ আদালতের অন্যান্য বিচারক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জেলা জজশীপে মোট ২০টি বিচারকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত বিচারক রয়েছেন ১১ জন। বিচারকের ৯টি পদই শূন্য। একইভাবে জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেসিতে বর্তমানে ৪ জন ম্যাজিষ্ট্রেট কর্মরত আছেন। ৪টি জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট এর পদ শূন্য রয়েছে। ফলে আদালতের শূন্য পদে বিচারক সংকট থাকায় অতিরিক্ত বিচারকার্য চালাতে তাদেরকে হিমশিম খেতে হয়।
দ্রুত মামলা হ্রাসের ব্যাপারে সিনিয়র সহকারী জজ মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর জানান, বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ মোঃ গোলাম কিবরিয়া ২০১৫ সালের মার্চ মাসে পিরোজপুর জেলায় যোগদানের পর থেকেই সাধারণ বিচার প্রার্থীরা যে প্রকারে অল্প সময়ের মধ্যে ন্যায্য বিচার পান এবং অহেতুক অর্থ ও সময় নষ্ট না করে আনিত অভিযোগ থেকে মুক্তি পান সে লক্ষেই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার এ প্রচেষ্ঠার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পিরোজপুর আদালতের মামলার জট নিরসন হচ্ছে।
আদালতে দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলা প্রসঙ্গে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মোঃ মামুন আলী জানান, জেলা জজশিপে ২০১৭ এপ্রিল মাস পর্যন্ত সিভিল ও ফৌজদারী মিলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সর্বমোট ১৪ হাজার ৭১৬টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৪৪২টি এবং বিচারাধীন মামলার মামলার সংখ্যা ১৪ হাজার ২৭৪টি। এছাড়া ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল মামলা রয়েছে ২ হাজার ৮৬০টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৫৬টি এবং বিচারাধীন ২ হাজার ৮০৪টি।
অন্যদিকে, জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে অনিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৭ হাজার ৬৩৮টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত ১৭৫টি ও বদলিকৃত ১৮৭টি এবং বিচারধীন রয়েছে ৭ হাজার ২৫৬টি মামলা।
জেলা জজশিপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ আবু জাফর মোল্লা জানান, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির প্রথম ধাপ হচ্ছে তদন্ত সঠিকভাবে নিরুপণ করে সময়মতো রির্পোট দেয়া এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকাটা অপরিহার্য। ফলে যত দ্রুত সাক্ষ্য শেষ হবে, তত দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি হবে।
অন্যদিকে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, একটি মামলা আদালতে দায়ের হওয়ার পর বিচারক পর্যন্ত যেতে প্রায় এক থেকে দেড় বছর বা এরও বেশি সময় লেগে যায়। এরপর সাক্ষ্য নেয়ার জন্য প্রস্তুত হলে দেখা যায় সাক্ষীরা ঠিকানা বদল করে অন্যত্র চলে যান বা ওই স্থানের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে অন্যস্থানে বসবাস করেন, আবার যথা সময়ে তাদেরকে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ সাক্ষ্য দিতেও অস্বীকৃতি জানান। ফলে অধিকাংশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হয় না। ফলে মামলাগুলো আর আগায় না।
পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) খান মোঃ আলাউদ্দিন জানান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সমূহের মধ্যে অন্যতম একটি অধিকার হলো আইনের দৃষ্টিতে সমতা। পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ মোঃ গোলাম কিবরিয়া এখানে যোগদানের পর থেকে আদালত অঙ্গন থেকে সকল অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অপসংস্কৃতি দূর করেছেন। তার দূরদর্শীতার কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে জটিলসহ সকল ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হতে শুরু করেছে।
এদিকে, মামলা নিস্পত্তির পাশাপাশি জেলা ও দায়রা জজ মোঃ গোলাম কিবরিয়ার প্রচেষ্ঠায় আদালতে বিচারের জন্য কারাগার থেকে আনা হাজতিদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা, বিচার প্রার্থী ও আদালতের কাজে আসা লোকজনের বসার জন্য আদালতের প্রতিটি তলার বারান্দায় বেঞ্চ ও সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থা করা এবং আগতদের সুপেয় পানিপানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা জজশীপের সিনিয়র সহকারী জজ মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর জানান, প্রায় দু’শত বছরের অধিক সময়ের পুরনো প্রথা ভেঙ্গে পিরোজপুর আদালতে হাজতিদের দুপুরের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। পিরোজপুরের বিজ্ঞ জেলা জজের উদ্যোগে এই মানবিক আয়োজনটি চালু করা হয়। তিনি বলেন, একদিন আদালত চলাকালীন সময় হাজতখানার দিক থেকে হৈ চৈ এর আওয়াজ আসে বিজ্ঞ জেলা জজ মহোদয়ের কানে। বিচক্ষণ জেলা জজ অনুসন্ধান করে জানতে পারেন যে, হাজতিদের অধিকাংশ সকালে দুটি রুটি খেয়ে কোর্টে এসেছে এবং সারাদিন অভূক্ত অবস্থায় আছে। কারাগারে নিতে দেরী হলে তারা রাতের খাবারও হয়তো পাবে না, এ আশংকায় দ্রুত কারাগারে নেয়ার জন্য হৈচৈ করছে আসামীরা। এর কয়েকদিন জেলা জজ মহোদয় জেল ভিজিটে গেলে কোর্টে হাজতীদের দুপুরের খাবার প্রসংগে আলাপে জানতে পারেন যে, আদালতে প্রেরণের সময় হাজতীদের দুপুরের খাবার হিসেবে চিড়া-গুড় সাথে করে দিয়ে দেয়া হয়। কোর্ট থেকে ফেরার পর হাজতিরা একেবারে রাতের খাবার গ্রহণ করে। এসময় তিনি কারা কর্তৃপক্ষ ও কারাগারে খাবার সরবরাহকারি ঠিকাদারের সাথে হাজতিদের দুপুরের খাবার আদালতে প্রেরণের বিষয়ে আলাপ করেন। কিন্তু তারা পরিবহন সমস্যার কথা উল্লেখ করে অনাগ্রহ দেখান। পরে বিজ্ঞ জেলা জজ জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে বিস্তারিত আলোচনাপূর্বক এই মর্মে নির্দেশনা প্রদান করেন যে, কারা কর্র্তৃপক্ষ হাজতীদের জন্য দুপুরের খাবার আদালতের হাজতখানায় সরবরাহ করবেন এবং হাজতখানায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যগণ খাবার পরিবেশনের বিষয়টি তদারকি করবেন। এছাড়া হাজতখানার ভারপ্রাপ্ত জুডিসিয়াল ম্যজিষ্ট্রেট দুপুরে খাওয়ানোর বিষয়টি সরাসরি তদারকি করবেন। ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে এ কার্য্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিচার প্রার্থী জনগন এবং বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিশুদ্ধ খাবার পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করনের লক্ষে পিরোজপুর পৌরসভার সহায়তায় রিভার্স ওসমোসিস টেকনোলজির তিনটি আধুনিক পানি বিশুদ্ধকরণ মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ বিচারপ্রার্থী জনগনের বসার জন্য জেলা জজ আদালত ভবনের প্রত্যেকটি ফ্লোরের বারান্দায় পর্যাপ্ত সংখ্যক বেঞ্চ এবং তাদের স্বস্তির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এছাড়া আইনগতভাবে ভিত্তিহীন ডান্ডাবেড়ী নিষিদ্ধ করে বেআইনী অবমাননাকর শাস্তির প্রচলন রোধ করতঃ মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন পিরোজপুরের জেলা জজ মোঃ গোলাম কিবরিয়া।
সিনিয়র সহকারী জজ মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর জানান, একটি ফৌজদারী মিস কেস শুনানীর প্রাক্কালে পিরোজপুরের জেলা জজ মোঃ গোলাম কিবরিয়া দুইটি সাধারণ প্রকৃতির সি.আর মামলায় অভিযুক্ত ৭০ বছরের একজন বৃদ্ধ ও রুগ্ন ব্যক্তিকে ডান্ডাবেড়ী পড়িয়ে আদালতে হাজির করার কারণ জানার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলারকে তলব করে আদালতে আনেন। জেলার এ বিষয়ে কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে না পেরে তখনই জেলা কারাগার থেকে চাবি এনে ডান্ডাবেড়ী খুলে দেন। উক্ত বিষয়ে জেল সুপারকে লিখিত বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দিলে তিনি জানান যে, কোর্ট ইন্সপেক্টর পিরোজপুর কর্তৃক প্রেরিত ০৯/১০/১৩ তারিখের ৬৮১০ নং স্মারকে একাধিক মামলায় অভিযুক্ত আসামীদের কোর্টে প্রেরণের পূর্বে ডান্ডাবেড়ী পরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করায় কারা কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত কার্য করেছে। তবে ২টি সাধারন সি.আর মামলায় অভিযুক্ত একজন বৃদ্ধকে ডান্ডাবেড়ী পরানোর জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। উক্ত ঘটনার পর থেকে পিরোজপুর জেলা কারাগার থেকে আদালতে আনা নেওয়ার সময় কোন বিচারাধীন বন্দীকে ডান্ডাবেড়ী পড়ানো হচ্ছে না। এভাবে বিচারাধীন বন্দীদেরকে বেআইনী অবমাননাকর ও নৃশংস শাস্তি পাওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

