প্রধান সূচি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন || কমতে পারে পিরোজপুরের আসন সংখ্যা

ফসিউল ইসলাম বাচ্চু :
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণের নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইন অনুযায়ী আঞ্চলিক অখন্ডতা, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও জনসংখ্যার হারথ এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু কমিশন এবার জনসংখ্যা বাড়লেও বড় শহরগুলোতে আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিতে চাইছে। এতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরসহ বড় সিটি করপোরেশন এলাকার আসন সংখ্যা কমতে পারে। কমতে পারে পিরোজপুর জেলার আসন সংখ্যা। জেলার তিনটি আসনের স্থলে দুটি আসন হওয়ার আশংকা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পরিকল্পনায় কমিশনের চেষ্টা থাকবে গ্রামাঞ্চলের আসন বাড়ানো। সেটা সম্ভব না হলেও শহরে কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না। আসনভিত্তিক উন্নয়ন বৈষম্য ঠেকাতেই এমন পরিকল্পনার কথা জানান কর্মকর্তারা। তাদের মতে, শহরাঞ্চল যেহেতু ঘনবসতিপূর্ণ, তাই ভোটার সংখ্যা বা জনসংখ্যার বিবেচনায় আসন নির্ধারণ করলে একসময় দেখা যাবে একটি জেলার সমান ঢাকা সিটির একটি ওয়ার্ড হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের আসন কমে যাবে এবং সেখানে উন্নয়ন বরাদ্দ কম হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রশাসনিক এলাকা এবং বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোকে সমন্বয় করতে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে। সর্বশেষ আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় সংসদের আসনগুলোর সীমানা
পুনর্বিন্যাসে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ৫৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছিল। এরপর আর আদমশুমারি হয়নি। সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকে সম্প্রতি ১৯৮৪ সালের পদ্ধতিতে আসন বিন্যাসের প্রস্তাব দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন ইসির জন্য সহজ হচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে. এম. নুরুল হুদা বলেছেন, আঞ্চলিক অখন্ডতা বজায় রাখা এবং প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জন্য ভোটারসংখ্যার যথাসম্ভব সমতার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হবে। গ্রামের আসন যাতে না কমে সেদিকে নজর দেয়া হবে।
কে. এম. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির প্রস্তাবিত রোডম্যাপে চলতি বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সীমানা পুননির্ধারণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজ শুরুর আগে সীমানা নির্ধারণ আইন ও বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে কমিশন। বিশেষ করে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ-১৯৭৬, বিদ্যমান ইংরেজি আইনটি বাংলায় রূপান্তর ও এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হচ্ছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে সীমানা নির্ধারণের নতুন আইন প্রণয়নও জরুরী।
নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, বিগত পাঁচ বছরে নতুন উপজেলা, পৌরসভাসহ সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদে কিছু প্রশাসনিক এলাকা যুক্ত হয়েছে। বিদ্যমান প্রশাসনিক ইউনিটও পরিবর্তন হয়েছে। আবার ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমানা চুক্তির ফলে ছিটমহলগুলো বিলুপ্ত হয়ে নতুন কিছু ইউনিয়ন জন্ম নিয়েছে। এসব বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটারসংখ্যায় ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। এবারের সীমানা পুননির্ধারণে এই তারতম্য যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বড় সিটিগুলোতে মানুষ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান আইন অনুসারে জনসংখ্যা বা ভোটারসংখ্যার সমতা রেখে সংসদীয় আসনে পরিবর্তন আনতে গেলে ঢাকা জেলায় বর্তমানের ২০টি থেকে আসন কয়েকটি বাড়াতে হতে পারে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও তাই। অন্যদিকে কমতে পারে পটুয়াখালী, পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলার আসনসংখ্যা। এছাড়া একই জেলার মধ্যে অনেক আসনের সীমানাও পাল্টে যেতে পারে।
এসব বিবেচনায় নিয়ে কমিশন মনে করছে, মহানগর এলাকা এবং গ্রামাঞ্চলের জন্য আসনপ্রতি ভোটারসংখ্যা একরূপ হবে না। মহানগরী এলাকার একটি আসনের জন্য পাঁচ লাখ ভোটার নির্ধারিত হলেও গ্রামের একটি আসনের জন্য এই সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ তিন লাখ। এতে শহর ও গ্রামের আসনে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে। উন্নয়ন বরাদ্দের বৈষম্যও কমানো যাবে। শহরে সরকারি-বেসরকারি নানা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও গ্রামাঞ্চলের আসনগুলোতে একই পরিমাণ বরাদ্দ থাকে না।
সাবেক সিইসি ড. এ টি এম শামসুল হুদাও বর্তমান কমিশনের এই পরিকল্পনা সমর্থন করে বলেছেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ তাদের কর্মসংস্থানসহ নানা কারণে বড় শহরে চলে আসে। এ কারণে বড় শহরগুলোর জনসংখ্যা ও ভোটার ক্রমশ বাড়ছে। তাই বিদ্যামান আইন সংশোধনের পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে গেলে বড় শহরে আসনসংখ্যা বাড়বে। কমবে গ্রামের আসন। কিন্তু উন্নয়নের স্বার্থে গ্রামের আসন কমানো উচিত নয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সংসদের আসন সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী কমিশনের সদস্য মোঃ শাহনেওয়াজ বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও একই বিবেচনায় গ্রামের আসন যাতে না কমে তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসন পুনর্বিন্যাস করা হয়েছিল। বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে তিনি বলেন, এই আইনটি যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। কেননা আসনবিন্যাসের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমহারে সবার প্রতিনিধিত্ব যাতে সংসদে নিশ্চিত করা যায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারও বলেন, মহানগরগুলোর আসন নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের আগে নিশ্চয়ই কমিশন সবার মতামত গ্রহণ করবে বলে আশা করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে ভোটার রয়েছে ১০ কোটি ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৭৫৭ জন। বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার তিনটি আসনের ভোটার ১০ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯০ জন। বাকি ৬১টি জেলার ২৯৭টি আসনের ভোটার ১০ কোটি আট লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৭ জন। সেই হিসেবে প্রতিটি আসন এলাকার ভোটার হওয়া দরকার তিন লাখ ৩৯ হাজার ৫০৭ জনের কাছাকাছি।
ঢাকা জেলার ভোটার সংখ্যা ৭৫ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৬ জন। জাতীয় গড় অনুসরণ করলে এই জেলা ২২টি আসনের দাবি রাখে, যা যুক্তিযুক্ত মনে করা হচ্ছে না। বর্তমানে ঢাকা জেলার ২০টি আসনে গড়ে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৯৮০ জন করে ভোটার রয়েছে। গাজীপুর জেলার পাঁচটি আসনের বিপরীতে ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৫২ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি আসনে চার লাখ ৭০ হাজার ১৩০ জন। এ সংখ্যা সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই জেলায় সাত বা আটটি আসন করতে হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি আসনে ভোটার ১৯ লাখ ৯৩ হাজার ৩৫২ জন। প্রতিটি আসনে তিন লাখ ৩৯ হাজার ৫০৭ জন। ভোটারের সমতা আনতে গেলে এ জেলায় আসন বাড়াতে হবে। চুয়াডাঙ্গা জেলার দুটি আসনে গড়ে ভোটার রয়েছে চার লাখ ২১ হাজার ৫১৩ জন। তবে পটুয়াখালী জেলার চারটি আসন এলাকার মোট ভোটার ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৯, অর্থাৎ প্রতি আসনে গড়ে দুই লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ জন। সারাদেশের সাথে সমতা বিধান করতে গেলে এ জেলায় চারটি আসন রাখা যায় না। পিরোজপুর জেলার তিন আসন এলাকার মোট ভোটার আট লাখ ৪ হাজার ২১ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি আসনে দুই লাখ ৬৮ হাজার। ফলে এ জেলায় তিনটি আসন বহাল রাখা যায় না। এছাড়া শরীয়তপুর, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, খুলনা, ঝালকাঠি, লক্ষ্মীপুর, লালমনিরহাট, মাদারীপুর, মেহেরপুর ও নড়াইল জেলার আসনগুলোর গড় ভোটার তিন লাখের কম। এজন্য বর্তমান কমিশনের পরিকল্পনা হচ্ছে জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা উভয়কে প্রাধান্য দিয়ে বড় বড় শহরের আসন সংখ্যা সীমিত করে দেয়া।
আয়তন, ভৌগোলিক অখন্ডতা তথা নদী-নালায় বিভক্ত কি-না সেটা দেখা ও উপজেলা ঠিক রেখে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করাটাই যৌক্তিক মনে করছেন কমিশন কর্মকর্তারা।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের (পূর্ব পাকিস্তান) সীমানা অনুসারে সম্পন্ন হয়। নির্বাচন কমিশন ১৯৭২ সালের ২০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে। এরপর দেশের প্রথম আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে নির্বাচন কমিশন ১৯৭৬ সালের ১৯ মার্চ ৩০০ আসনের সীমানা নির্ধারণ সম্পর্কিত দাবি, আপত্তি, পরামর্শ চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর আলোকে কয়েকটি জেলার আসনসংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি করে ১৯৭৮ সালের ২৭ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়। এই সীমানা অনুসারে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ১৯৮১ সালে দ্বিতীয় আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৃতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর ছয় জেলায় ছয়টি আসন কমিয়ে বৃহত্তর তিন জেলায় পাঁচটি ও পার্বত্য এলাকায় একটি আসন বাড়ানো হয়। ওই সময় বড় জেলাগুলোকে ভেঙে মোট ৬৪ জেলা করা হয়। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের আগে দুটি আন্তঃজেলা (বরিশাল-পিরোজপুর ও নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ) নির্বাচনী এলাকা সৃষ্টি করা হয়। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০১ সালের আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই অনুসারে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি ব্যাপকভাবে সীমানা পুনর্বিন্যাস করে। ফলে ৩৩ জেলার ১২৫টি নির্বাচনী এলাকার পরিবর্তন ঘটে। ওই সময় পার্বত্য তিনটি জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলার সীমানা পুননির্ধারণ করা হয়। ঢাকায় ১৩টি থেকে বেড়ে আসন হয় ২০টি। সর্বশেষ কাজী রকিবের কমিশন ১৯ জেলার ৫৩টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করে। ঢাকায় দুটি নির্বাচনী এলাকার আংশিক পরিবর্তন ঘটানো হয়।

 

Please follow and like us:


« (পূর্ববর্তি সংবাদ)



উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial