প্রধান সূচি

সালমা রহমান হ্যাপী

সবিতা রানীর জয় গাঁথা

সবিতা, বাড়ি পিরোজপুর জেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নে। চার ছেলে মেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার। স্বামী দিনমজুর তার উপর অসুস্থ। দিশেহারা সবিতা ছেলে মেয়েকে লেখাপড়া শিখাবে নাকি মুখে ভাত তুলে দেবে? এরমধ্যে বসত বাড়ি নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে ঝামেলা, এক সময় ছেলেদের সাথে প্রতিবেশির সাথে মারামারি হলে অপর পক্ষ মামলা দিয়ে দিল সবিতার ছেলেদের নামে। থানায় টাকা দেয়ার ক্ষমতা নাই সবিতার, নিরুপায় সবিতা পিরোজপুর জেলা মহিলা পরিষদের দারস্থ হলো। মহিলা পরিষদের সভানেত্রী মনিকা দি সব শুনে আমার কাছে পাঠালেন সবিতাকে। ওর জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করে মামলা তুলে দিলাম। ওকে জিজ্ঞেস করলাম ছেলেরা কি করে- সবিতার সরল উত্তর মেট্রিক পরীক্ষা দেবে কিন্তু ফর্ম ফিলাপের টাকা নাই। শুনে টাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।

অনেক দিন সবিতার দেখা নাই। একদিন হঠাৎ এসে আমাকে বলে ভাবি আর পারছিনা, আমাকে একটু রাস্তার কাজে দেন চেয়ারম্যান, মেম্বর দিতে চায় না। জানতে চাইলাম তোমার ছেলের রেজাল্ট কি? বললো আর একদিন বলবো। আমার একটু রাগ হলো, বললাম আসলে তোমরা কাজ করতে চাওনা চাও শুধু সাহায্য। আজকাল কত এনজিও, কত সংস্থা আছে। ব্র্যাক, যুব উন্নয়নসহ আরো কত সংস্থা আছে তারা হাস-মুরগী, গাভী পালন, কৃষি কাজ, মহিলাদের স্বাস্থ্য সেবা বিভিন্ন বিষয়ের উপর ট্রেনিং দেয়, তুমি তোমার ছেলে মেয়েদের নিয়ে এইসব জায়গায় যাও, ট্রেনিং নেও। নিজেদের পায়ে দাড়াও।

তবে তোমাকেই বা কি বলবো, যারা ট্রেনিং দেয় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখবে একটি হাস মুরগী কিংবা গরু মাছের খামার নেই!

তারপর প্রায় দেড় বছর সবিতার সাথে আমার দেখা নাই। হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার সবিতা আমার বাসায় হাজির খুব জোর গলায় ভাবি, ভাবি করছে, আমি একটু অবাকই হলাম, কে এই মহিলা, এত জোরে ডাকে এবং খুব দৃঢ়তার সাথে বাসার ভিতরে ঢুকলো। বললাম কে তুমি? উত্তরে বললো- আমি সবিতা। কোন সবিতা, আমি ঠিক মনে করতে পারছিনা। ও বললো- ভাবি আমাকে এখন চিনতে পারছেন না! আমি সেই সবিতা যার জন্য কত কি না করেছেন। করাটা ভাবি বড় কথা না, কিন্তু আপনার একটা কথায় আমার জীবন বদলে গেছে গো ভাবি। আমি আপনার কাছে অনেকবার এসেছি, কিন্তু আপনাকে পাই নি। ভাইজান (সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান খালেক) শুনছি মেলা অসুস্থ, আপনে তারে নিয়া এখন ঢাকায় বেশী থাকেন। ভাইজান এখন কেমন আছে। কত কথা যে আপনার সাথে বলতে ইচ্ছ করে, ভাবি আজ আমি কিছু নিতে আসি নাই, এখন আমি অনেককে অল্প হলেও দিতে পারি। আমার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে ভাবি…..!!! সেদিন আপনি জানতে চেয়েছিলেন আমার ছেলের রেজাল্ট, আমি কোন উওর দিতে পারি নি। কারণ ভাবী সেদিন আপনার দেয়া ফর্ম ফিলাপের টাকা দিয়ে ছেলে-মেয়ের পেটের ক্ষুধা নিবারণ করেছিলাম!

ক্ষুধা কি আর পরীক্ষা বোঝে?

এবার আমার ছেলেকে কলেজে ভর্তি করেছি। ভাবি বলেছিলেন না কাজ করো নিজের পায়ে দাড়াও। সেই থেকে বিভিন্ন এনজিও, সংস্থা, যুব উন্নায়নের হাতে পায়ে ধরে শুধু ট্রেনিং নিয়েছি, তারপর চার ছেলেমেয়ে নিয়ে সেকি কঠিন পরিশ্রম………! এখন আমার পুকুরে মাছ আর হাস পালি। দুইটা দুধের গাভি ভালো দুধ দেয়। আর লোন নিয়ে কোরবানির চার পাঁচ মাস আগে গরু কিনি, কোরবানির সময় বিক্রি করি। ভালো ব্যবসা পাই। ভাবী এবার কোরবানির গরু কিন্তু আপনি আমার কাছ থেকে কিনবেন। ভয় নাই ভাবী, গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট আমি খাওয়াই না। গ্রামের সবার বাড়ি বাড়ি বালতি রেখে আসি তারা ভাতের মার রেখে দেয়। ভুষি আর তাজা ঘাস খাওয়াই। কিনবেন তো ভাবি? আমি শুধু মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওর ঘুরে দাড়ানোর গল্প শুনছি!!! আরো কতো কি গল্প- বাড়ি বাড়ি গিয়ে গর্ভবতী মায়েদের খোজ নেই, টিকা দেয়ার সময় হলে ম্যাটানিটিতে নিয়ে আসি, তারা যে যা পারে দেয়। ভাবী কাজ করে টাকা নেই, ‘চুরিও করিনা, হাত পেতে সাহায্যও নেই না’।

আপনি কি বলেন ভাবী? আমি কি বলবো- সবিতা আমার যে এখন তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে বড্ড ইচ্ছে করছে, তুমি কি বুঝতে পারছো সবিতা?

ভাবী আর একটা কথা আপনাকে বলতে এসেছি। মনে মনে বলি বলো সবিতা তোমার জাগরনের কথা!! বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ টাকা চায়, আমার এলাকার কয়েকজন পায় নি। আমি কি তাদের আপনার কাছে নিয়ে আসবো? আমি বললাম অবশ্যই। তবে সবিতা এ কাজটিও তুমিই করবে, আমি শুধু পথ এবং পদ্ধতি বলে দেবো। তুমি পারবেনা সবিতা? সবিতার গলার স্বর আরো দৃঢ়, বললো অবশ্যই পারবো!!!! আমি কাল ওনাদের নিয়ে আসবো। ভাবী এখন যাই বাড়িতে অনেক কাজ।

সবিতা সগৌরবে বেড়িয়ে যাচ্ছে, আমি ওর পায়ের পদচারণার দিকে চেয়ে আছি…… আমার চোখ থেকে কি পানি পড়ছে? না তাতো হওয়ার কথা নয়!

সবিতারা জেগে উঠছে!!! এমন সুখের দিনে কাঁদতে নেই।

লেখক ঃ সাধারণ সম্পাদক, পিরোজপুর জেলা মহিলা পরিষদ।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial