প্রধান সূচি

মানুষ মানুষের জন্য

অসহায়দের সহায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ফ্রী এ্যাম্বুলেন্স

মিজানুর রহমান :

প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার টাকাই হাতে নেই, তার উপর ডাক্তার বলেছেন রোগীকে জরুরী ভিত্তিতে খুলনায় নিয়ে যেতে হবে। মাথায় হাত দিয়ে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের বারান্দায় দিশেহারা অবস্থ্য়া বসে ছিলেন শহরের মধ্যরাস্তার রিক্সাচালক জালাল উদ্দিন। কিভাবে সামলাবেন ভাইয়ের চিকিৎসা খরচ সে ভাবনায় কাতর তিনি। এসময় স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এ্যাম্বুলেন্স বিনা খরচায় পৌছে দিল তাদের গন্তব্যস্থল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

“মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য; একটু সহানুভুতি কি মানুষ পেতে পারে না?” উপমহাদেশ প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ভুপেন হাজারিকার কালজয়ী এ গানের কথাকে হৃদয়ে ধারন করে পিরোজপুর শহরের কয়েকজন যুবক অক্লান্ত পরিশ্রম করে এ বছরের মে মাস থেকে শুরু করেছে দুঃস্থ মানব কল্যাণ সংস্থার মাধ্যমে ফ্রী এ্যাম্বুলেন্স সেবা। দরিদ্র অসহায় রোগীদের জন্য এ সেবা বিনা খরচায় এবং স্বচ্ছলদের জন্য দুরত্ব অনুযায়ী নির্দিষ্ট খরচ দিতে হয়। এজন্য কোন দরখাস্ত, সুপারিশ বা তদবিরের প্রয়োজন পরেনা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে লাগানো স্টিকারে দেয়া সংস্থার একাধিক মোবাইল নাম্বারে (০১৭৯০-৫২৯৯৬৬,০১৯৯৯-৩৬৫৩৫৪) দায়িত্বপ্রাপ্তদের জানালেই এ্যাম্বুলেন্স পৌছে যায় নির্দিষ্ট স্থানে।

যাদের প্রচেষ্টায় এ মানবিক সেবা তাদের পথচলার শুরুটা মাত্রই ২০১৪ সালের এক পরন্ত বিকেলে। স্থানীয় জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে কয়েকজন বন্ধুর আড্ডায় হঠাৎ উপস্থিত হন শহরতলীর কদমতলা গ্রামের পুর্ব পরিচিত রিকশাচালক মোঃ মাসুম। তার স্ত্রী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ। এদিকে হাতে কোন টাকা নেই। উপস্থিত বন্ধুরা মাসুমের আকুতি অগ্রাহ্য করতে না পেরে তখনি ছুটে যান স্বচ্ছলদের দুয়ারে। তাদের আহবানে বিমুখ হননি কেউই। অল্প সময়ের মধ্যে জুটে যাওয়া সংগ্রহ ও নিজেদের দেয়া সাহায্য মোট ৫০ হাজারে ঠেকে। সব টাকাই তুলে দেয়া হয় মাসুমের হাতে।

কিছুদিন বাদে ঢাকায় চিকিৎসা শেষে সুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে মাসুম বাড়িতে ফেরেন এবং কৃতজ্ঞতা জানাতে উপস্থিত হন ঐ যুবকদের কাছে। পরোপকারী যুবকদের চোখ তখন আনন্দাশ্রুতে ঝাপসা হয়ে পড়ে। আর এই ঘটনাটি গভীরভাবে দাগ কাটে যুবকদের মনে। মাসুম ও তার স্ত্রীর হাসিমুখ তাদের টেনে নিয়ে যায় মানবকল্যাণের মহাসড়কে। এরপর তারা নিজেরা বসে এ ধরনের কাজ চালানোর প্রত্যয়ে যুথবদ্ধ হন এবং ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর গঠিত হয় দুঃস্থ চিকিৎসা তহবিল যা পরবর্তীতে দুঃস্থ মানবকল্যান সংস্থা নামে রূপান্তরিত হয়।
প্রতিষ্ঠাকালের ৫ জন থেকে বর্তমানে এ সংস্থার সম্মানিক সদস্য সংখ্যা ১২০ জন। এদের মধ্যে ছাত্র, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সরকারি বেসরকারী চাকুরে এমনকি প্রবাসীরাও আছেন। তবে কেউ চাইলে যেকোনো মুহুর্তেই দুঃস্থ মানবকল্যাণ সংস্থার সদস্য হতে পারেন।

নামকরনেই পরিচয় মেলে দুঃস্থ মানব কল্যান সংস্থার। ৩৩ মাসের চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে সদস্যদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আছে অনেক দুঃখ বেদনার ভারাক্রান্ত ঘটনার সংগ্রহ। তাঁরা সর্বদা দরিদ্র মানুষের পাশে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে চান। এজন্য তাদের চাওয়া শুধু একটাই -সমাজের সচেতনও স্বচ্ছল মানুষদের সহানুভূতি ও সহায়তা।

সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ অসহায় লোককে বিভিন্ন অংকের সাহায্য দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দরিদ্রদের চিকিৎসা ক্ষেত্রেই সাহায্যের পরিমান বেশী। এছাড়াও মেয়ের বিয়ে, পরীক্ষার ফি এবং শিক্ষা উপকরন ক্রয়, অগ্নিকান্ডে ঘর পুড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য প্রদান করা হয়েছে।

সাহায্য প্রাপ্তদের মধ্যে পিরোজপুর সদরের নামাজপুর গ্রামের রিক্সাচালক আব্দুস সালামের ছেলে মোঃ শামিম ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে উন্নত চিকিৎসা নিয়েছেন। শহরের মধ্যরাস্তা এলাকার রিকশা চালক নুরুল ইসলামের স্ত্রী অন্তসত্তা অবস্থায় মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। এ অবস্থায় তার একটি কণ্যা শিশুর জন্ম হয়। কিন্তু স্ত্রীর অস্বাভাবিক আচরনে কণ্যা শিশুটির জীবন আশংকা দেখা দিলে নুরুল সংস্থার দ্বারস্ত হন এবং এ সংস্থার সাহায্যে খুলনায় উন্নত চিকিৎসা নিয়ে উভয়ই সুস্থ্য হন। সদর উপজেলার উত্তর রানীপুর গ্রামের কৃষি শ্রমিক শাহজাহান শেখের দুই বছরের শিশু পুত্র সজীব অসাবধানতায় ধান সিদ্ধ করার পাত্রে পড়ে দগ্ধ হয। তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। এভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত ইন্দুরকানী উপজেলার হাফেজ ঈছা মুনশী, শহরের আদর্শ পাড়ার বাসিন্দা মাদ্রাসাছাত্র আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, শহরতলীর কণ্যাদায়গ্রস্থ এক পিতা, সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার জিলবুনিয়া গ্রামের যুবক মনিরুল ইসলামকে কৃত্রিম পা কিনে দেয়াসহ দুর্ঘটনার শিকার অসহায় অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের সাহায্য দেয়া হয়েছে।

এ ব্যপারে সংস্থার সদস্য মোঃ মুরাদ সরদার বলেন, সাহায্য প্রার্থীদের আমরা সবসময় খুব বেশী পরিমান টাকা দিতে না পারলেও প্রাথমিক ভাবে আমাদের দেয়া অর্থ দিয়ে তারা অন্তত চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।

সংগঠন পরিচালনা বিষয়ে সংস্থার সদস্যরা জানান, সংস্থার যেকোন বিষয়ে, যেকোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাজ কিংবা যাতায়ত ও যোগাযোগ ইত্যাদির জন্য পরস্পর নিজেরাই ব্যক্তিগতভাবে সমান খরচ বহন করেন। সংস্থার তহবিল শুধুমাত্র মানবিক সাহায্যের জন্যই ব্যয় হয় এছাড়া আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত প্রতি মাসে সদস্যদের অবগত করানো হয় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে।

এখন সংস্থার সদস্যদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে সরকারি নিবন্ধন, ব্লাড ডোনার ক্লাব প্রতিষ্ঠা, পথশিশুদের সহায়তা এবং বিনামূল্যে শবদেহ পরিবহনের গাড়ি ক্রয় ইত্যাদি। দুঃস্থ মানব কল্যাণ সংস্থার সাথে যুক্ত যুবকেরা আমাদের এই শহরেরই সন্তান। এরা দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। দেশের মাটি ও মানুষের টানে যার যার সাধ্যমত সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। আর দুঃস্থ মানব কল্যান সংস্থার কার্যক্রমের পরিসর ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে এটাই তাদের স্বপ্ন।

শুরু থেকে দায়িত্ব পালনকারী এ সংস্থারই একজন মোঃ মাসুদুর রহমান সুমন বলেন, যে কোন সহায়তা প্রদানের আগে সমস্যার ধরন, সাহায্য প্রার্থীর সামর্থ, ইত্যাদি বিবেচনা করে দ্রুতই সাহায্য পৌছে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ১১ জনের একটি পরামর্শ কমিটি আছে যাদের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, চিকিৎসা ক্ষেত্রকেই আমরা বেশী অগ্রাধিকার দেই। কারন একটা সময় আমাদের দেশে অনেক মানুষ খাদ্যের অভাবে কষ্ট পেত। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশ অনেক এগিয়েছে। মানুষের এখন আর আগের মত খাদ্যের কষ্ট নেই বললেই চলে। কিন্তু এখোনো টাকার অভাবে অনেক অসহায় মানুষ ঠিক ভাবে চিকিৎসা করাতে পারেনা। এ কারনে প্রথমে আমরা দুঃস্থ চিকিৎসা সেবা কর্মসূচি চালু করি। এরপরে দেখলাম আমাদের এখানে বিভিন্ন ক্লিনিক, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ও হাসপাতালে যে সমস্ত রোগী আসেন তার প্রায় ২৫ শতাংশ রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল-খুলনা এমনকি ঢাকা পর্যন্ত যেতে হয়। সেই ভাবনায় আমরা এ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য আবারো তহবিল সংগ্রহে নামি। হাতে হাতে সংগ্রহ হয় ১৬ লক্ষ টাকা । এরপরে ঢাকায় গিয়ে পিরোজপুরের বাসিন্দা এক গাড়ি ব্যবসায়ীর নিকট উপস্থিত হই। তিনি আমাদের অনুদান হিসেবে দিলেন ২ লক্ষ টাকা এবং ৪ লক্ষ বাকিতে ২২ লক্ষ টাকা দামের একটি এ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করি।

বর্তমানে এ্যাম্বুলেন্স কেনার বকেয়া পড়ে থাকা ৪ লক্ষ টাকা পরিশোধ নিয়ে সদস্যরা চিন্তিত। বাকি টাকার সংস্থান, পাশাপশি দুঃস্থ কল্যানের কাজ কিভাবে চলবে? আমরা সবাই যদি সামর্থ অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই তবে সব অসম্ভব ই সম্ভব হয়ে উঠবে একদিন। সেই সুদিনের প্রত্যাশায় দুঃস্থ কল্যাণ সংস্থার সদস্যরা ।

(দুঃস্থ মানব কল্যান সংস্থার ব্যাংক হিসাব নম্বর মোঃ মাসুদুর রহমান, সঞ্চয়ী হিসাব নং ২৩৬১৯ ইসলামী ব্যাংক পিরোজপুর, বিকাশ নাম্বার ঃ ০১৭১২-৫৫২৯৮৯)

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর পিরোজপুর জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক ডাঃ মিজানুর রহমান বাদল বলেন, বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশে^র একটি দেশে সরকারের একার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমাজের বিত্তশালী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এগিয়ে আসা। সেই দৃষ্টিকোন থেকে পিরোজপুরের উদ্যমী কিছু যুবকের ঐকান্ত চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফসল দুঃস্থ মানব কল্যাণ সংস্থা। আমি আশা করব বিত্তশালীসহ সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ এধরনের একটি মহৎ কাজে তাদেরকে সাহায্য করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সেখ বলেন, এধরনের একটি মহৎ উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। যেকোন প্রয়োজনে আমার কাছে আসলে আমি তাদের সার্বিক সহযোগীতা করব।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial