আলী যাকের
সংযমের মাসে একান্ত ভাবনা
বসেছিলাম আমার গ্রামের বাড়ির পেছনের বারান্দায়। মৃদু হাওয়া বইছিল।
অন্ধকার রাত। সামনে আদিগন্ত বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। আমাদের নিচু এলাকায় সাধারণত যেমন হয়ে থাকে, বর্ষার সময় নদী উপচে পানি ঢুকে পড়ে ক্ষেতের ভেতর। এগুলো ছোটখাটো নদী। আমাদের দেশের লোকেরা একে বলে গাং। নদী বলতে ওদের কুণ্ঠা হয়। এসবই একসময় ছিল কৃশকায় খাল। কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের অধীনে আস্তে আস্তে খালটি চওড়া হয়ে এখন একটা কৃশকায় নদীর রূপ নিয়েছে। আরো ব্যাপার আছে। আমরা অর্থাৎ বাঙালিরা তো জন্মগতভাবে কবি, তাই সব কিছুর একটা কাব্যময় নাম দেওয়ার প্রবণতা আমাদের সহজাত। তাই আমাদের গাং এখন যমুনা নামে পরিচিত। যাহোক, আমি বসেছিলাম আমার বাড়ির পেছনের বারান্দায়, আমি গ্রামে এলেই যেমন প্রায়ই রাতে করি। তবে এই রাতটি ছিল একটি বিশেষ রাত। শবেবরাতের রাত। এই রাতে, বলা হয়ে থাকে, সৃষ্টিকর্তার কাছে যা চাওয়া যায় তিনি তা-ই মানুষের জন্য বরাদ্দ করেন। শবেবরাত শব্দটি ফারসি। আরবিতে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘লায়লাতুল বরাত’। আমি অনেক আরব দেশের মানুষের মুখে শুনেছি যে আরব দেশে লায়লাতুল বরাত বলতে কোনো রাত নেই। তারা এটা উদ্যাপন করে না। অবশ্য তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি জানি, যেকোনো সমাজে প্রচলিত সামাজিক বা ধর্মীয় আচার, তা যেখান থেকেই আসুক না কেন, সেই সমাজের জন্য তা-ই বৈধ।
যেমন আমরা বাল্যকাল থেকে আমাদের পূর্বপুরুষদের মুখে বিদায় সম্ভাষণ হিসেবে খোদা হাফেজ শুনে এসেছি। এটিই আমার জন্য সত্য। আমি কেন নতুন কোনো সম্ভাষণে নিজেকে ভারাক্রান্ত করতে যাব? আমার বারান্দায় আমি বসেছিলাম শবেবরাতের রাতে এবং আমি শুনছিলাম চারদিকে বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভেসে আসা ওয়াজ মাহফিলের ভাষণ। বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে তাঁদের বক্তব্য দিচ্ছিলেন। কোনো কোনো সময় হাওয়ায় ভেসে সেই বক্তৃতা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে আসছিল। আবার কোনো কোনো সময় সেই ভাষণ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছিল। তবে এই শোনা, আধাশোনায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে তাঁদের সবারই বক্তব্য কমবেশি এক। তাঁরা সবাই বলছিলেন, মানুষের জন্য এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী। আমাদের উচিত পরবর্তী সময়ের চিরস্থায়ী আবাসের জন্য নিজেদের তৈরি করা। এবং একজন মুসলমানই শুধু মৃত্যুর পর বেহেশতে যেতে পারবে। বাকিরা সব পুড়বে দোজখে। তাঁরা সবাই দোজখের আগুন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভয়াবহ ব্যবস্থার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করছিলেন।
এসব বয়ান শুনলে ভয়ে শরীর কেঁপে ওঠে। আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে যায়। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই বেহেশতের যে বর্ণনা তাঁরা দিচ্ছিলেন সেটি বড়ই লোভনীয়। সেখানে বিলাস-বৈভবের প্রচুর সমাগম। খাদ্য, পানীয়ের নানা ধরনের জিহ্বায় পানি আসা বিবরণ যেকোনো মানুষকে প্রলুব্ধ করে তুলতে পারে। একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করলাম। এই বর্ণনা একেকজন তাঁর নিজস্ব ধ্যানধারণার মতো করে দিচ্ছেন। বোধ হয় এর কারণ হলো এই যে যেসব মানুষ ভাষণ দিচ্ছেন তাঁরা তো সবাই একই শ্রেণি, শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থানের নন। ফলে কারো বর্ণনায় আমরা বিরিয়ানি, কোরমা-কালিয়ার কথা শুনছিলাম। অবশ্যই তার সঙ্গে ছিল শরাবন-এ-তহুরা। আবার কারো বর্ণনায় পিঠা-পুলি, ম-া-মিঠাই ও সুপেয় মিষ্টি পানি। ইসলাম ধর্ম আমাদের এই শেখায় যে দুষ্কৃতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীনভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং সুকৃতির প্রশংসা করতে হবে নির্দ্বিধায়। আমার মা বলতেন যে কোনো মানুষের মন ভেঙে দেওয়া আর মসজিদ ভাঙা সমান পরিত্যাজ্য। অতএব, ধর্মগুরুদের মানুষের মনের খবরও রাখতে হবে বৈকি। অথচ আমরা নিত্যই তাবত দুষ্কৃতি করে চলেছি। আর আমাদের ধর্মগুরুরা কখনোই এর বিরুদ্ধে কিছু বলছেন না। তাঁদের হাতে রয়েছে একাধিক শক্তিশালী অস্ত্র। যেমন বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সমাগত ধর্মপ্রাণ মানুষ, যারা শুনতে আগ্রহী এবং আছে একটি মাইক্রোফোন, যার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে কথা শোনানো যায়। আমরা অতিপ্রয়োজনীয় অথচ আপাত সাধারণ কথাগুলো তাঁদের কাছ থেকে শুনতে পাই না।
এখন চলছে রমজান মাস। মুসলিম উম্মাহ এই সময় সিয়াম সাধনায় নিমগ্ন। এই মাসে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের কর্তব্য হলো সংযম সাধনা করা। আমরা সব ধরনের ভোগ, লালসা ও অতিশয়োক্তি থেকে বিরত থাকব। অথচ এই মাসে ঘটছে ঠিক তার বিপরীত। যে মাসে আমাদের সংযম সাধনার জন্য তুলনামূলকভাবে কম ও অপেক্ষাকৃত সাধারণ খাদ্য গ্রহণ করা উচিত, সেই মাসে আহার্য বস্তুর মূল্য দ্বিগুণ, তিন গুণ হয়ে যায় কিভাবে? দাম তো বাড়ে চাহিদা বাড়লে! এ মাসে তো চাহিদা কমে যাওয়ার কথা। অথচ আমরা ছুটছি ভালো ভালো খাবার সংগ্রহ করতে। সাধারণত আমরা যা খাই প্রতিদিন, পরিমাণ ও মূল্যের হিসাবে তার দ্বিগুণ, তিন গুণ আমরা খাচ্ছি এই সংযমের মাসে। এ কারণেই বোধ করি সব খাদ্যদ্রব্যের এমন অগ্নিমূল্য এখন বাংলাদেশে। রমজান শুরু হওয়ার আগে আগেই একটি চ্যানেলে খবরের মধ্যে দু-একটি খ- সাক্ষাৎকার পরিবেশন করা হলো। এখানে বেশ উঁচু শ্রেণির একজন মহিলা বললেন যে এই রমজান মাসে সব পণ্যের দোকান প্রতিদিন রাত ১০টা বা তারও অধিক সময় পর্যন্ত খোলা রাখা উচিত। তিনি এও বললেন যে বস্তুতপক্ষে এ মাসে বাজারের সময় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত অন্যায়।
ভদ্রমহিলা ঠিকই বলেছেন। তাঁর মতো ক্রেতাসাধারণ আছেন বলেই আমরা দেখি যে এই সংযমের মাসে যেকোনো রাস্তার দুই ধারে আয়োজন করা হচ্ছে জিহ্বায় পানি আনা সামগ্রীর। এবং ইফতারের বহু আগেই সব উপাচার উড়ে যাচ্ছে। এবারে ইফতারের সময় নির্ধারিত হয়েছে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা প্রায় পৌনে ৭টায়। অথচ ইফতার কেনার ধুম পড়ে যাচ্ছে সেই বিকেল ৩টা থেকেই। বিকেল সাড়ে ৩টার সময় সব বড় রাস্তায় প্রচ- জ্যাম। অথচ হওয়ার কথা ছিল এমন যে মানুষ রমজানের সময় প্রতিদিনের কাজ আরো আগ্রহ নিয়ে করবে। আরো নিরবচ্ছিন্নভাবে করবে। কেননা এ মাসেই খাওয়াদাওয়ার কোনো ঝামেলা নেই দিনের বেলায়। কিন্তু হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। তাহলে আমাদের সংযম সাধনার বিষয়টি গেল কোথায়?
এতক্ষণ সংযমের ব্যাপারে যে কথাগুলো বললাম সেগুলো ভোক্তাসম্পর্কিত। যা বাদ পড়ে গিয়েছিল; কিন্তু এই আলোচনার অন্তর্গত হতেই হবে তা হলো ব্যবসায়ীর স্বার্থসংবলিত কথাবার্তা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে মধ্যম আকারের ব্যবসায়ীরাই আমাদের ভোক্তাবাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এর সঙ্গে জোট বাঁধে মধ্যস্বত্বভোগীরা। রমজান মাস ঘনিয়ে এলেই তাদের চোখ চকচক করে ওঠে। তাদের অনেকেই ধর্মভীরু মুসলমান এবং রমজান মাসে সোয়াব কামানোর ব্যাপারে সচেতন। কিন্তু তার কোনো ছাপ তাদের ব্যবহারিক জীবনে পড়ে বলে মনে হয় না। ব্যবসায় তারা যথেচ্ছাচারে বিশ্বাসী। এই পবিত্র মাসটিতে তারা বেশুমার মুনাফা করতে মুখিয়ে থাকে। যেন সারা বছর ধরেই তারা প্রতীক্ষায় থাকে সিয়ামের এই পবিত্র মাস কবে আসবে। অথচ মুখে তাদের ধর্মীয় কথা বলতে বলতে ফেনা উঠে যায়। এই ধরনের স্ববিরোধী আচরণ আমাদের জীবনে, ব্যবসায়ীর ও ভোক্তার, নিত্যই দেখতে পাই আমরা। আজ যখন এই কলামটি লিখছি তখন মনে পড়ল বিদ্রোহী কবি নজরুলের কথা। বাল্যকালে বাবার কাছে শোনা এবং পরে অনেকবার উচ্চারিত তাঁর কবিতার চরণটি মনে পড়ে গেল।
‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসেনি নিদ
দীনহীন সেই গরিবের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’
এমন যে কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি, তাঁর দেশে আমরা কিভাবে এ ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় অনাচার চলতে দিতে পারি? ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘উড়ঁনষব ঝঃধহফধত্ফ’, বাংলায় জুতসই কোনো প্রতিশব্দ নেই এর। দ্বৈত মান বললে চলতে পারে। আমরা দেখি যে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে এই ‘উড়ঁনষব ঝঃধহফধত্ফ’ দ্বারা আমরা সজ্ঞানে ও আগ্রহভরে পরিচালিত হই। মুখে সৎ, সততা ও নির্লোভ হওয়ার ব্যাপারে অনেক কথা বলি; কিন্তু কাজের বেলায় করি তার ঠিক উল্টোটা। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এ বিষয়ে ভোক্তা ও ব্যবসাদারের মধ্যে কোনো তফাত নেই। আমাদের নিত্যদিনের জাগতিক কর্মকা-ে আমরা যদি সৎ না হতে পারি, সত্যের পথে না চলতে পারি, তাহলে সৃষ্টিকর্তা কি আমাদের কখনো ক্ষমা করবেন? এই কথাগুলো সমাজের সর্বস্তরে সব মানুষের ভেবে দেখা একান্ত প্রয়োজন। আমার এই সোজাসাপ্টা কথায় কেউ যদি বিব্রত হন, তাহলে গোস্তাকি মাফ করবেন।
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
