প্রধান সূচি

নাজিরপুরে বংশীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাড়ী ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট || আহত-১০

নাজিরপুর প্রতিনিধি :

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নে বংশীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের দেয়া আগুনে ৫টি বসতঘর ভষ্মিভূত হয়েছে। এ সময় প্রতিপক্ষরা ওই ঘরের মূল্যবান মালামাল লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্থরা। এ ঘটনার সময় ওই ঘরে থাকা নারী-পুরুষসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নাজিরপুর থানার ওসিসহ পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের পেনাখালী গ্রামে বংশীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দাড়িয়া, হাওলাদার ও শেখ বংশের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। ওই বিরোধের জের ধরে ২০১১ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে পেনাখালী বাজারে দুই বংশের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এর পরের দিন হাওলাদার বংশের লোকজন দাড়িয়া বংশের মিজান দাড়িয়া নামের একজনকে কুপিয়ে জখম করে এবং ওই বছরের ৮ নভেম্বর রাজাকার পুত্র নব্য আওয়ামী লীগ নেতা টিপু সুলতানের নেতৃত্বে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দাড়িয়া বংশের বাড়ী-ঘরে হামলা চালায়। রক্তক্ষয়ী এ সংঘর্ষে ইয়াহিয়া দাড়িয়া ও বাবুল শেখ নামে দুজন নিহত হয় এবং দেড় শতাধিক আহত হয়। এ সময় টিপু বাহিনীর সন্ত্রাসীরা পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে জালিয়ে দেয় দাড়িয়া বংশের শতাধিক বসতঘর। ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থানায় ইয়াহিয়া হত্যা মামলাসহ নাজিরপুর থানায় মোট ১০টি মামলা করে। যার মধ্যে হত্যা মামলাসহ ৯টি মামলার প্রধান আসামী টিপু সুলতান। এছাড়া টিপু সুলতানের সহযোগী মালিখালী ইউনিয়নের ঝনঝনিয়া গ্রামের দেলোয়ার শেখের ছেলে মুজাহিদ শেখ, আবু সাঈদ শেখ ও রাজিব শেখ, মৃত বেলায়েত শেখের ছেলে হিটু শেখ এবং মিঠারকুল গ্রামের আবু বকর হাওলাদারের ছেলে নুরনবী হাওলাদারও বিভিন্ন মামলার আসামী।

কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে টিপুর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এবং পুরস্কার স্বরূপ রাজাকার পুত্র টিপু সুলতানকে নাজিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও তার বড় ভাই শাহজাহান শেখকে মালিখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয়। এর পর থেকে টিপু সুলতানসহ তার বাহিনীর সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। টিপুর নেতৃত্বে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকান্ড শুরু হয়। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লার ছেলে নাজমুল হক লাল্টু ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানসহ অনেক নিরহ মানুষ মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

এক পর্যায়ে টিপু বাহিনীর নানা অত্যাচারে এবং মালিখালী ইউনিয়নকে মাদকের সর্গরাজ্যে পরিনত করায় ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সুমন মন্ডল মিঠু নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ টিপু বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মালিখালী ইউনিয়নকে মাদকমুক্ত ঘোষণা করেন। জনতার প্রতিরোধের মুখে টিপু বাহিনী এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। মালিখালী ইউনিয়নকে মাদকমুক্ত করার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ওই ইউনিয়নের মিঠারকুল গ্রামের মৃত মালেক হাওলাদারের ছেলে হাজী নিজাম হাওলাদার (৫০) চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারী সকালে ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল আমীন শেখ ও যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুজন মোল্লাকে সাথে নিয়ে মোটর সাইকেলযোগে উপজেলার মাটিভাঙ্গা যাচ্ছিলেন। সকাল ৮টার দিকে তারা মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের বইবুনিয়া নামক স্থানে পৌঁছলে পূর্ব থেকে ওৎপেতে থাকা টিপু সুলতানের সহযোগী মালিখালী ইউনিয়নের ঝনঝনিয়া গ্রামের দেলোয়ার শেখের ছেলে মুজাহিদ শেখ, আবু সাঈদ শেখ ও রাজিব শেখ, মৃত বেলায়েত শেখের ছেলে হিটু শেখ এবং মিঠারকুল গ্রামের আবু বকর হাওলাদারের ছেলে নুরনবী তাদের মোটর সাইকেলের গতিরোধ করে তাদের মারধর করে। এক পর্যায়ে তারা নিজামকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তার দুইপা ভেঙ্গে দেয় এবং মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে। এ ঘটনার পর থেকে টিপু বাহিনীর সদস্যরা পলাতক ছিল।

গত সোমবার রাতে টিপু বাহিনীর প্রধান সহযোগী মুজাহিদ শেখসহ অন্যান্যরা এলাকায় প্রবেশ করে তাদের বাড়ীতে অবস্থান করে। এ সংবাদ পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে দাড়িয়া বংশের নেতৃত্বদানকারী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বাবলু দাড়িয়া ও নজরুল দাড়িয়ার নেতৃত্বে ৪০/৫০ জন দেশীয় অস্ত্রসহ মুজাহিদ শেখের বাড়ি-ঘরে হামলাসহ অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে বলে অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্থরা। এ সময় তাদের হামলায় মুজাহিদ শেখ, আবু সাঈদ শেখ, রাজিব শেখ, জাহাঙ্গীর ফকির, তারিকুল শেখ, তাজরুল হাওলাদার, নাজিম শেখ ও বাবু শেখ জখম হয়। তাদের দেয়া আগুনে দেলোয়ার শেখ, জাকির শেখ, দুলাল শেখ ও মুজাহিদ শেখের বসত ঘর ভষ্মিভূত হয় এবং ঘরে থাকা বিপুল পরিমাণ ধানসহ মূল্যবান মালামাল পুড়ে যায়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাবলু দাড়িয়া ও নজরুল দাড়িয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

টুঙ্গিপাড়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘ঘটনার সংবাদ পেয়ে সকাল ১০টার দিকে আমরা ঘটনাস্থলে পৌছে প্রায় ১ ঘন্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হই।’

এ ব্যাপারে নাজিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, দু’পক্ষের আদিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial