প্রিমিয়ার ব্যাংক যেন বিএইচ হারুনের পৈত্রিক সম্পত্তি !
বিশেষ প্রতিনিধি :
কখনও প্রিমিয়ার ব্যাংকে অন্যের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন কখনও বা মর্টগেজ ছাড়া ঋণ নেয়া থেকে শুরু এমন কোন অনিয়ম নেই যা এমপি বিএইচ হারুন করেন নি। ভাইস চেয়ারম্যান থাকার সুবাদে হারুন সেখানে নিজস্ব একটি শক্তিশালি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এই সিন্ডিকেটের বাইরে সেখানে কোনও ঋণ অনুমোদন, কারো প্রমোশন, বদলি কিছুই হতো না। বিএইচ হারুন ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়েই অনেকটা নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি বানিয়েছিলেন প্রিমিয়ার ব্যাংককে। জানা গেছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব অনিয়ম করেও ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে গেছেন বার বার। সম্প্রতি বনানীর বিএইচ হারুনের মালিকানাধীন রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঘটনায় কাকতালীয়ভাবে একের পর এক বেরিয়ে আসছে তার সব অপকর্মের অজানা ইতিহাস।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রনালয় এবং দুদক নিজ নিজ সংস্থা থেকে দুর্নীতির প্রমান পায়। অধিকতর তদন্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও দুদককে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। জানা গেছে, ২০০৮ সালের শেষের দিকে বি এইচ হারুন এই দুর্নীতি করে। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বংশাল শাখা থেকে জাল স্বাক্ষর প্রদান করে রুমী এন্টারপ্রাইজের এসটিডি ০১১৯১১৩১-০০০০০৮৭১ হিসাব নাম্বার থেকে ব্যাংক কর্মকর্তার যোগ-সাজেশে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে এমপি হারুন ১৩৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করেন। ২০১৪ সালে এসে তার এসব দুর্নীতি প্রমানিত হয়।
পরবর্তীতে গ্রাহকের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রিমিয়ার ব্যাংকের এই শাখা পরিদর্শন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম । তাতে অভিযোগের সত্যতা পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করতে তা দূর্ণীতি দমন কমিশন (দুদক) এ প্রেরণ করা হয়। এ ছাড়া এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম স্বাক্ষরিত একটি সার সংক্ষেপ অর্থমন্ত্রী বরাবরে প্রেরণ করা হয়। এতে অর্থমন্ত্রী জালিয়াতের হাত থেকে অর্থ উদ্ধার এবং শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দেন। এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন বছর কেটে গেছে আত্মসাৎকারি বিএইচ হারুন এতটাই দাপুটে যে সবকিছু প্রায় ধামাচাপা দিয়ে চলছেন। আজ অবধি কানাকড়ি অর্থ ফেরত পাননি রুমী এন্টারপ্রাইজের মালিক খলিলুর রহমান।
এদিকে অর্থ ফেরতে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম সময়কে জানান, আমি এখনো কোন অর্থ ফেরত পাইনি। তবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।তিনি জানান, হারুন যে কোনও সময়ে আমায় মেরে ফেলতে পারে।
বিএইচ হারুন প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। আর এ ঋণ নিয়েছে বিভিন্ন নামে। নিজে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্ধারিত সীমার বাইরে ঋণ নিতে না পারায় তার মালিকানাধীন কাজী কন্ট্রাকশনের বিভিন্ন পরিচালকের নামে ঋণ নিয়েছেন। যা বর্তমানে খেলাপি হওয়ার পথে। কাজী এন্টারপ্রাইজের ৩টি হিসাব নাম্বারে প্রিমিয়ার ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ নেন এবং কোন ধরণের মর্টগেজ না দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকে বনানী শাখা থেকে কিসমা ট্রেডিং, আকবর এন্টারপ্রাইজ নামে ব্যাংকের মতিঝিল শাখাসহ নামে বেনামে মোট ৩০ কোটি টাকা নেন এমপি হারুন।
এ বিষয়ে এমপি বিএইচ হারুনের সাথে যোগাযোগ করে তিনি ফোন না ধরায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ভাই মুজিবুল হক কামালের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথম সময়কে নামে-বেনামে নেয়া ঋণের কথা স্বীকার করেন। এ সময় তিনি বলেন, আমরা কিস্তির মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছি। এসব অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করেছেন এবং ব্যাংক ঋণের বিপরীতে কোনও সহায় সম্পত্তি জমা দিয়েছেন কিনা তেমন প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি এই প্রতিবেদককে বারবার তার অফিসে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং বিষয়টি মিটমাট করার কথা বলেন।
এ বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমডি খন্দকার ফজলে রশিদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশের বাইরে আছেন বলে জানান। এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, এমপি বি এইচ হারুন গত কয়েক বছরে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। যা তদন্তে নেমেছে দুদক। সম্প্রতি দুদক তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য দুই জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার যোগ-সাজেশে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ, অর্জিত অর্থ দিয়ে ঢাকা ব্যাংকের দেনা পরিশোধ, ব্যাংকসহ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ক্রয়, বনানী ও বারিধারায় বহুতল ভবন র্নিমাণ, বিলাসবহুল ৪টি গাড়ী ক্রয়ের বিষয়ে অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। এছাড়া তার ছেলে নাহিয়ান হারুনকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক বানিয়েছেন এই ক্ষমতাধর এমপি বিএইচ হারুন। (চলবে)।
