প্রধান সূচি

আমরা যেন বধির হয়ে গেছি ॥ তাসমিমা হোসেন

পহেলা বৈশাখের ভোরবেলা। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙল। আমাদের বাসাটা ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের কাছেই। কানে এল উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেম থেকে ভেসে আসা ইংরেজি গানের মূর্ছনা। গানটি হলো ব্ল্যাক ম্যাজিক উইম্যান। আশির দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই গানটি আমার বরাবরই প্রিয়। একটু পর শব্দ থেমে গেল। বুঝলাম, বোধকরি মাইক টেস্টিং চলছে। যাক, মাইকের বিরক্তির ফুঁ-ফা বা নাম্বারিং টেস্টিং পদ্ধতিতে না গিয়ে ওরা টেস্ট করছে ইংরেজি গান দিয়ে। সকাল দশটার পর শুরু হলো বাংলা গান। চলল সারাটা দিন।

পরে বুঝলাম বৈশাখী মেলা বসেছে বুঝি। নিরাপত্তার জন্য দশ বারো জন পুলিশকে টহল দিতে দেখলাম। ভালোই গরম পড়েছিল সেদিন। শরীরটাও ভালো ছিল না বিশেষ। এর মধ্যে অমন শব্দনিনাদের উপদ্রবে শান্তি বা স্বস্তি পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। বারিধারার বাসিন্দা এক বন্ধু ফোন করে বলে, আপা আপনার সাহেব তো পরিবেশ মন্ত্রী। উনাকে একটু ব্যবস্থা নিতে বলুন না- শব্দদূষণের জ্বালায় শান্তিতে ঘুমাতে পারি না।

সবদিকেই শব্দদূষণ পীড়াদায়ক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। সরকারের তরফেও নানা স্তরে আলাপ-আলোচনা এবং বিধি ব্যবস্থা গ্রহণ যে একেবারেই হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু সমস্যা রয়েই গেছে। হাইড্রলিক হর্ন যে কত ভয়ঙ্কর, তা আমরা সকলেই কমবেশি জানি। সেটা বন্ধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। তার ওপর ইদানীং রাজধানী ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোতে স্কুল-কলেজের আধিক্যের কারণে তীব্রতর হচ্ছে যানজট।

যানজটের গাড়িগুলো নিশ্চল হয়ে থাকলেও ড্রাইভারদের বোধহয় হাত নিশপিশ করে হর্ন বাজাতে। কিন্তু হর্ন দেওয়া হলে কী হবে, গাড়ি তো সরার জায়গা নেই। আমরা যত বেশি আধুনিকতার দিকে এগোচ্ছি ততই যেন নাগরিকসুলভ স্বাভাবিক কর্তব্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। উন্নত দেশে একান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ হর্ন বাজায় না। কেউ বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা বেআইনি কিছু করলে পেছনের গাড়িচালককে হর্ন বাজিয়ে প্রতিবাদ করতে দেখেছি। এবং এইভাবে উন্নত দেশে যাকে হর্ন বাজিয়ে সতর্ক করা হয়, তার জন্য বেশ অপমানজনক। আমাদের দেশে যেন নিজের ওপর রাগ করেই বারবার হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। গাড়ি চালকদের কোনো সিভিক সেন্স আছে বলে মনে হয় না।

একবার তো এক মন্ত্রী মহোদয় বলেই বসলেন, ড্রাইভারদের লেখাপড়া জানার প্রয়োজন নেই, গরু-ছাগল চিনলেই হলো। মন্ত্রীর সে বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কথা হচ্ছে, গাড়ির ড্রাইভারদের নিয়মকানুন তো মানতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার দরকার হবে তাদের। বিষয়টা গাড়ির মালিকদেরও বুঝতে হবে। নাগরিকরা নানাধরনের ট্যাক্স সরকারকে দিচ্ছেন। এই তো বাংলা নববর্ষে এনবিআর হালখাতা করে অনেক ট্যাক্স আদায় করে নিল। বেশ ভালো কথা। ট্যাক্স নেওয়ার পাশাপাশি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা তো নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাহেব ২০১৬ সালের মার্চ মাসে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ঢাকাকে পুনরায় তিনি তিলোত্তমা করে তুলবেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবের মুখ দেখেনি। পরিণত বয়সে আইন বিষয়ে সামান্য পড়াশোনার সুযোগ আমার হয়েছিল। বিলেতে টর্ট ল বলে একটা আইন আছে। সেটা হলো ব্যক্তিগত অধিকার বিষয়। টর্ট কারো কর্তব্যবিচ্যুতির কারণে ঘটিত অপরের ক্ষতিজনিত দেওয়ানি অপরাধ। পনের শতকে সাধারণ আইনের আওতায় ইংল্যান্ডের বিচারকগণ সর্বপ্রথম টর্ট প্রতিবিধানের পক্ষে রায় প্রদান করেন। ক্রমশ ব্যক্তিগত অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে টর্ট প্রতিকারের জন্য যথাযথ আইন প্রণীত হয়। অপরাধীকে অপরাধে নিরুৎসাহিত করা এবং ব্যক্তিগত ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় হলো টর্ট আইনের উদ্দেশ্য। ধরুন, কারো প্রতিবেশী অনেক উঁচু শব্দে গান বাজাচ্ছে। সেটা ক্ষুন্ন করছে তার প্রতিবেশীর অধিকার। তিনি এ ব্যাপারে আইনের সহায়তা নিতে পারেন। সেটা আছে টর্ট আইনেই। ল্যাটিন Tortum থেকে এসেছে Tort শব্দটি। Tortum শব্দের অর্থ twist। (বাংলায়- বাঁকিয়ে দেওয়া বা প্যাঁচ লাগানো বলা যেতে পারে।) যদিও বাংলায় এর কোনো যথার্থ আইনি প্রতিশব্দ ব্যবহার হতে দেখা যায় না। সাধারণত একে ‘দেওয়ানি ক্ষতি’ বা ‘নিমচুক্তি’ কখনো ব্যক্তিগত অপকার হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। তবে বাংলাতেও টর্ট হিসেবেই বেশি প্রচলিত। টর্টের কোনো বিধিবদ্ধ আইন নেই। তথাপি পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এ আইনের প্রয়োগ ও বিস্তার বেশ ব্যাপক। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স সর্বপ্রথম এই টর্ট আইনের প্রয়োগ ঘটায়। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের দেশে এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। অথচ টর্ট আইনের মাধ্যমে আমরা আমাদের নাগরিক অধিকারকে সমুন্নত রাখতে পারি সহজেই।

আমরা পুনরায় শব্দদূষণের সমস্যার দিকে মনোযোগ দিতে পারি। শব্দদূষণের মর্মান্তিক শিকার কে নন? স্নায়ুবিক রোগের হার ও তীব্রতা বাড়ছে ধারাবাহিক শব্দদূষণের অনিবার্যতে। শব্দদূষণ রোধে আইন আছে, কিন্তু তার কোনো কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না। ২০০২ সালে উচ্চ আদালত থেকে হাইড্রোলিক হর্ন এবং বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী যে-কোনো ধরনের হর্ন গাড়িতে সংযোজনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং গাড়িতে বাল্ব হর্ন সংযোজনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। এই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও রয়েছে। তাছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ২৫, ২৭, ২৮ ধারামতে শব্দদূষণ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অর্থদ- ও কারাদ- উভয় প্রকার শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু এসব আইনের প্রয়োগ কোথায়? অথচ শব্দদূষণের কারণে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বধিরতা থেকে শুরু করে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া পর্যন্ত বেশকিছু মারাত্মক রোগের শিকার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি তিন বছরের কম বয়স্ক শিশু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে ১০০ ডিবি মাত্রার শব্দ শোনে, তাহলে সে তার শ্রবণ ক্ষমতা হারাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাধারণত ৬০ ডিবি শব্দ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে ফেলতে পারে এবং ১০০ ডিবি শব্দ সম্পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে হিসাব করে দেখা গেছে যে, ঢাকা শহরের যেকোনো ব্যস্ত সড়কে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৬০ থেকে ৮০ ডিবি, যানবাহনের শব্দ মিলে তা ৯৫ ডিবিতে দাঁড়ায়; মাইক বা লাউড স্পিকারের সৃষ্ট শব্দ ৯০ থেকে ১০০ ডিবি, কল কারখানায় ৮০ থেকে ৯০ ডিবি, মেলা-উৎসবে ৮৫ থেকে ৯০ ডিবি, স্কুটার বা মটরসাইকেলের ৮৭ থেকে ৯২ ডিবি এবং ট্রাক-বাসের সৃষ্ট শব্দ ৯২ থেকে ৯৪ ডিবি। সীমার বাইরের শব্দ দূষণ শ্রবণ ক্ষমতা ধ্বংস করার পাশাপাশি ওই ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্যকেও বিনষ্ট করতে পারে। এছাড়া শব্দদূষণ দ্বারা হূদযন্ত্র ও ফুসফুস আক্রান্ত হয়, বাধাগ্রস্ত হয় শিশুদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ।

শব্দদূষণ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে, বলা হচ্ছে, কিন্তু আমরা যেন বধির হয়ে গেছি। কেউ শুনছি না এমন নিরন্তর যন্ত্রণার কথা। এ দেশের নাগরিকদের এমন অসহনীয় শব্দদূষণকে মেনে নিয়েই দিনযাপন করতে হয়। অথচ আমরা নাকি ক্রমেই সভ্য হচ্ছি! জিডিপি বাড়ছে আমাদের। অঢেল উন্নয়নমূলক কাজ করছে বর্তমান সরকার। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এজন্যে স্যালুট জানাই। নির্দিষ্ট একেকটা কাজের জন্য একেকটা বিভাগ রয়েছে। সবাই যদি মনোযোগ দিয়ে যার যার কাজটা করে, তা হলে কোনো সমস্যা থাকে না।

লেখক : সম্পাদক, পাক্ষিক অনন্যা ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial