বাগেরহাটে চিংড়ি ঘেরে মড়ক দেখা দিয়েছে
মোঃ কামরুজ্জামান, বাগেরহাট :
বাগেরহাটে অজ্ঞাত রোগে মড়ক দেখা দিয়েছে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির ঘেরে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার কয়েক লাখ বাগদা চিংড়ি চাষি। হঠাৎ করে দেখা দেয়া চিংড়ির মড়কে এরই মধ্যে জেলার কয়েক হাজার ঘেরের বাগদা চিংড়ি মরতে শুরু করেছে। চিংড়ি ঘেরে হটাৎ এই মড়কের কারণ বা রোগ সম্পর্কে জেলা মৎস্য বিভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও চিংড়ি চাষীরা ধারনা করছে পানি স্বল্পতার কারনে চিংড়ি ঘেরে এ মড়ক দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ও ষাটগুম্বুজ, ডেমা, যাত্রপুর, বেমরতা ইউনিয়নসহ রামপাল ও মোড়েলগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার চিংড়ি চাষী।
বাগেরহাট মৎস্য বিভাগের বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ জিয়া হায়দার চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, এ বছর জেলার নয়টি উপজেলায় ৭০ হাজার ঘেরে চিংড়ির চাষ করা হয়েছে। জেলায় চিংড়ির বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ২৭১ মেট্রিক টন। চিংড়ি ঘেরে মড়ক লাগার পর আমাদের কর্মকর্তারা মাঠে চাষিদের ঘেরগুলো পরিদর্শন করেছে। চাষিদের সচেতন করতে নানা পরামর্শ দিচ্ছি। চিংড়িতে মড়ক লাগার কারণ জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।
বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচএম রাফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, চাষিরা যে পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করে তা পরিকল্পিত না। তাদের ঘের প্রস্তুতিতে সমস্যা রয়েছে। যার কারনে মৌসুমের শুরুতেই বাগদা চিংড়িতে মড়ক লেগেছে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে চিংড়ি মারা যাচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে। আমরা মারা যাওয়া চিংড়ির নমুনা সংগ্রহ করে পরিক্ষা-নিরিক্ষা করছি। দ্রুতই ঘেরে চিংড়ি মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
অপরদিকে চিংড়ি চাষীরা বলছেন, জেলার মংলা-ঘষিয়াখালি নৌ চ্যানেলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃত বাগেরহাট-রামপাল সড়কের ডেমা ইউনিয়নের খেগড়াঘাট সংলগ্ন বিসনা নদীর শাখা হজির খাল। হজির খালের রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি শাখা। আর এই শাখা খাল দিয়েই সদর উপজেলার ডেমা, বালিয়াডাংগা, হলদাহ্ মৌজা, কালিয়া, খেগড়াঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবাহিত হয়। জোয়ার-ভাটার সরাসরি প্রবাহ থাকায় এই অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা হজির খালের পানির প্রবাহের উপর নির্ভর করে। কিন্তু প্রবাহমান এ খালটির বিভিন্নস্থনে বাঁধ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা চিংড়ি ঘের করছেন। আর এ কারনেই অন্যান্য খালের পানির স্থর নিচে নেমে যাওয়ায় তীব্র গরমে চিংড়ি ঘেরে মড়ক দেখা দিয়েছে।
এদিকে সরোজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাগেরহাট-রামপাল সড়কের ডেমা ইউনিয়নের খেগড়াঘাট সংলগ্ন হজির ব্রিজের নিচের প্রবাহমান হজির খালে বাঁধ দিয়ে চিংড়ি ঘের করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। প্রবাহমান এ খালটির রয়েছে বেশ কয়েকটি শাখা। যা দিয়ে উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের বালিয়াডাংগা, হলদাহ্ মৌজা, কালিয়া, খেগড়াঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহিত হয়। আর এই অঞ্চলের মৎস্য চাষি বিশেষ করে চিংড়ি চাষিরা হজির খালের পানির প্রবাহের উপর নির্ভর করে।
ডেমা ইউনিয়নের খেগড়াঘাট সংলগ্ন হজির ব্রিজের নিচের একটি বাঁধ ছাড়াও খালের বিভিন্ন স্থানে এমন আরও অন্তত তিনটি বাঁধ দেয়া হয়েছে। প্রবাহমান হজির খালে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের নামে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে প্রবাহ হারিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে খালটি। আর এতেই আশপাশের ঘের গুলোতে সৃষ্টি হয়েছে পানি স্বল্পতা। পানির অভাবে মড়ক দেখা দিয়েছে বাগদা চিংড়ির ঘেরে। সেই সঙ্গে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ওই অঞ্চলে তীব্র জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া হজির খালে পানির প্রবাহ না থাকার এর প্রভাব পড়ছে অন্যান্য ছোট ছোট খাল গুলোতে। এতে এই অঞ্চলের পরিবেশে-জীববৈচিত্র ও জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তাই স্থানীয় এলাকাবাসি দ্রুত প্রবাহমান এ খালটির বাঁধ অপসারন করে পানির সাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবী জানিয়েছেন।
